Sunday, 18 October 2026

অযোধ্যা গ্রামের বোনেদি দুর্গাপুজো

 




একবেলার ছোট্ট এক সফরে চলুন দেখে আসি পুরানো দিনের সেই বোনেদি দুর্গাপুজো। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে উনিশ শতকের পরাধীন ভারতে বাংলার দুর্গাপুজো মানেই ছিল জমিদার বা রাজবাড়ির পুজো। সেই সব পুজোর মধ্যে কিছু ছিল বেশ নাম করা। সেগুলির মধ্যেই অন্যতম বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর ব্লকের দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে প্রাচীন বর্ধিষ্ঞু অযোধ্যা গ্রামের জমিদার বাড়ির পূজো। হ্যাঁ, তবে আগে যে জাকজমক ছিল  তা আর এখন নেই।  আর্থিক অনটনই এর অন্যতম কারণ।  তাই তখনকার দিনের মতন আয়োজন সম্ভব হয় না। তবে জৌলুসে খামতি থাকলেও আগেকার সব নিয়ম মেনেই আজ এই পুজো চলে আসছে। 




আরও দেখা যাবে এই  বংশের পূর্ব পুরুষ হরি বন্দোপাধ্যায় ১৬৪৫ সাল নাগাদ  অযোধ্যায় আসেন। ইনিই অযোধ্যা বসবাসকারী সমস্ত বন্দোপাধ্যায় বংশীয়দের আদি পুরুষ। তখন কিন্ত ইনাদের কোনও জমিদার  ছিল না।  হরি বন্দোপাধ্যায়ের অধস্তন চতুর্থ পুরুষ ছিলেন নিমাই চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। তার চার পুত্র ও এক কন্যা ছিল। ছেলেদের নাম....কৃষ্ণমোহন,  লালমোহন, রামমোহন  ও গদাধর।  কন্যার নাম ছিল  সখিমনি। রামমোহন চাকরির খোঁজে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে করতে হুগলির শ্রীরামপুরে আসেন এবং সেখানে চিক নামের এক নীলকর সাহেবের সাধারণ কর্মচারী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। নিজের সততা,  বুদ্ধিমত্তা, কর্ম তৎপরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় সাহেবের অত্যন্ত প্রিয়জন ও স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন।সাহেব তাঁকে দেওয়ান পদ দেন। কিছুদিন পর ঐ নীলকর সাহেব তখনকার দিনের এক দূরারোগ্য ব্যাধি কলেরাতে আক্রান্ত হন।  আশেপাশের সব মানুষজন ভয়ে তাঁকে রেখে পালিয়ে যান। কিন্ত রামমোহন বাবু তাকে সেবা শুশ্রুসা করার জন্য তার পাশেই থাকেন এবং বিশ্বস্ততার ও সততার পরিচয় দেন।  তখন সাহেব তার ভারতের সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক রামমোহনকে এবং বাকি অর্ধেক সম্পত্তি তার লন্ডনের বসবাসকারী স্ত্রীকে ভারতে এলে দিয়ে দিতে বলেন। তাই নীলকর সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর কথামত রামমোহন বাবু অর্ধেক সম্পত্তি সাহেবের স্ত্রীকে দেন বাকি অর্ধেক সম্পত্তি নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে আসেন।  এই সময় থেকেই বন্দোপাধ্যায় পরিবারের জমিদারি শুরু হয়।




একসময় জমিদারির দাপট ব্যাপক হয়ে উঠে। রামমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বৈভব ও দাপট বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এক কথায় বলা যায় এই সময়কাল  বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদারদের স্বর্ণযুগ। ১০৮ জন লাঠিয়াল সব সময় পাহারা দিত জমিদার বাড়ি ও জমিদারদের।  রামমোহন বন্দোপাধ্যায় সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ২২ খানা নীলকুঠি । তাদের  জমিদারি ছিল  অযোধ্যার প্রায় ৮৫টি মৌজায়। এছাড়াও তালডাংরা, বড়জোড়া ছিল এই জমিদারদের অধীনে। খাজনা আদায় করে আনা হত হাতির পিঠে করে। হাতি প্রবেশের জন্য তৈরী করা হয়েছিল বিরাট এক সিংহ দুয়ার। লোকেরা একে বড়ো ফটক বলত। খাজনা আদায় করে রাখা হতো আটচালায়। সেখানে আলাদা করা হত সোনা, রুপা , তামা, কাসাঁ ও পেতল । সেগুলি ঝুড়িতে করে আলাদা আলাদা করে নিয়ে গিয়ে রাখা হত কোষাগারে। আগে বিষ্ণুপুর রাজাদের কামানের গর্জন শুনে অষ্টমীর সন্ধিক্ষনে চালকুমড়ো বলি হত । তবে এখন পুঁজির সময় অনুসারে হয়ে থাকে। জমিদারীর বাড়বাড়ন্ত হয় এই রামমোহনের আমলেই।  পরবর্তীকালে গদাধর বন্দোপাধ্যায়ের আমলে জমিদারি আরও উন্নতি হয়।  জমিদারির এই অভূতপূর্ব উন্নতির জন্য   এবং জনকল্যান কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার  গদাধর বন্দোপাধ্যায়কে  " রায় বাহাদুর " উপাধিতে ভূষিত করেন। অযোধ্যার জমিদারের এই পদবী লাভ সে যুগে ওই অঞ্চলে তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক মস্ত বড় স্বীকৃতি ছিল।









সিংহদ্বার দিয়ে ঢুকে বামদিকে দেখতে পাবেন দ্বাদশ শিব মন্দির।  সিংহদ্বার লাগোয়া সমউচ্চতায় রয়েছে নহবতখানা। জমিদার বাড়ির যে কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানে এখানে সানাই-এর আসর বসতো। আজ সেই প্রায় ধ্বংসের মুখে। সিংহদ্বারের ডান পাশে রাখা আছে ১৮৬৭ সালে নির্মিত ৮ ফুট উচ্চতার পিতলের রথ। এখনও এই রথ রাস্তায় বার হয়। এবার সামনের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন গিরিগোবর্ধন মন্দির, দোল মন্দির,  রাস মন্দির।  পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে এই চার সহোদর ভাই তাঁদের মা রঙ্গিমনির নামে রাসমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রতি দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ ফুট ও উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট। এছাড়াও রয়েছে দুর্গামন্দির, নাটমন্দির ও তাঁদের কুলদেবতা রাধাদামোদরজিউ-এর মন্দির।  রাধামাধবজিউ মন্দিরে রয়েছে দুটি শালগ্রাম শিলা। বড়টির নাম বংশীগোপালজিউ এবং ছোটটির নাম রাধাদামোদরজিউ। ইনাদের নিত্য সেবা হয় এবং অন্ন ভোগ দেওয়া হয়। পূজো শেষ হলে বারটি শিবের পূজো আরম্ভ হয়। গিরিগোবর্ধন মন্দিরটি ১৮৩৫ সালে নির্মিত হয়েছিল। কৃষ্ণের গিরিগোবর্ধন ধারণের সুপরিচিত কাহিনীর অনুসরণে এই  দেবগৃহ। এই  মন্দিরটি অভিনব  শিল্পের নিদর্শন রাখে।মন্দিরটি উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট ও দৈর্ঘ্যগ্রন্থে ১৫ ফুট। সত্যিই এটি দেখবার মতন। গিরিগোবর্ধনের পূজো বছরে একদিন হয়। কালীপুজোর পরের দিন মন্দির খুলে পূজো করা হয়। এছাড়া সবসময় মন্দির বন্ধই থাকে। তবে অনুরোধ করলে মন্দিরের দরজা খুলে ঠাকুর দেখান জমিদার বংশের কেউ।








ইংরেজ সাহেবের বদন্যাতায় এই ব্যাপক উত্থান হলেও সবসময় দেশের মানুষের পাশেই থাকতেন জমিদার।  ইংরেজদের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের জমিদারিতে তিনি নীল চাষ বন্ধ করেছিলেন।  বাংলার গরীব চাষিদের রক্ষা করতে নীল চাষের পরিবর্তে ধান, সব্জি চাষের নির্দেশ দেন।  সভাবত: ইংরেজদের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু সম্পত্তি হারাতে হয়েছিল। তবুও ইংরেজদের সাথে আপোষ করেননি কখনও। ইংরেজরা  দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সরকার জমিদারি প্রথা বিলাপ করেন। যার ফলে এই বিশাল প্রভাব প্রতিপত্তি আস্তে আস্তে কমতে থাকে। বর্তমানে বেশিরভাগ জমি ও সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর যে টুকু পরে আছে তা দেবোত্তর ট্রাস্টের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ হয়। তাই বন্দোপাধ্যায় জমিদারদের প্রভাব প্রতিপত্তি সেরকম কিছুই আর না থাকলেও তাদের অতীতের ইতিহাস আজও অমলিন।








বন্দোপাধ্যায় পরিবারের বর্তমান সদস্য এবং দুর্গাপুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা জানালেন যে এই পুজো প্রায় ২০০ বছর আগে শুরু করেছিলেন রামমোহন বন্দোপাধ্যায়। তিনি দেবী মূর্তিতে কোনও এক বিশেষত্ব  চেয়েছিলেন।  তাই শ্রীশ্রী চন্ডীমঙ্গলের বর্ণনা অনুযায়ী দেবী সিংহবাহিনী নন, এখানে দেবী  ব্যাঘ্রবাহিনী। তাই বন্দোপাধ্যায় জমিদার বাড়ির দেবী দূর্গা চন্ডীধরি। এখানে প্রতিমার মুখ ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় না। বংশপরম্পরা প্রতিমা শিল্পী হাতে তৈরী করেন প্রতিমার মুখ। তাই প্রতিমাতে রয়েছে এক নজরকারা বিশেষ সাবেকিয়ানা। তিনি আরও দাবি করলেন যে এরকম মূর্তি বাঁকুড়া জেলায় আর দ্বিতীয়টি দেখা  যায় না। এছাড়া বাজনা হিসেবে থাকে ঢোল ও সানাই। এই পুজোতে ঢাক বাজানোর চল নেই।  তবে বর্তমানে সানাই বাদকের অভাব এবং টাকা পয়সার অপ্রতুলতার জন্য সানাই আর হয় না। শুধুমাত্র ঢোল বাজানো হয়।



 তাই দুশো বছরের এই দুর্গাপুজোর জাঁকজমক আগের চাইতে করলেও বন্দোপাধ্যায় বাড়ির ঐতিহ্য এবং রীতি আজও বজায় রয়েছে। আজও প্রাচীন রীতি মেনে পুজো এলেই ভাঁড়ার থেকে বের করে আনা হয় নবপত্রিকা আনার রুপোর ৫০ কে জি র পালকি  ও পূজার যাবতীয় রুপোর বাসন। এই পকলকি করে গ্রামের শেষপ্রান্তের দহঘাট থেকে নবপত্রিকা আনা হয়। বিসর্জন একই ভাবে হয় । পুরো পুজো বৈষ্ণব রীতি মেনে হয়। তাই অষ্টমীতে চালকুমড়ো বলি হয়ে থাকে। পুজো আরম্ভ হবার দিন থেকে যে সব রীতিনীতি পালন করা হত, তা আজও মেনে চলার চেষ্টা করা হয়। খুব জোরেই সঙ্গে জমিদার প্রতিনিধি জানালেন যে ভবিষ্যত প্রজন্মও এই নিয়ম কানুন ধরে রাখার চেষ্টা করবে। 




অযোধ্যা গ্রাম মাকুড়গ্রাম- জয়কৃষ্ঞপুর সড়কের পাশেই অবস্থিত।  সড়ক পথে বিষ্ণুপুর থেকে অযোধ্যার দূরত্ব ১৩.৭ কি মি। আর বাঁকুড়ার দূরত্ব ৩২.৯ কি মি.। জয়কৃষ্নপুর মোড় থেকে অযোধ্যা ৫.৫ কি মি দূরত্বে রয়েছে। আর যদি রেলে আসতে চান তবে নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হ'ল বিষ্ণুপুর  যা অযোধ্যা থেকে ১৭ কি মি দূরে।






অযোধ্যা গ্রামের এই বন্দোপাধ্যায় জমিদার বাড়ি অর্থাত সহজে চেনা যায় বাঁকুড়ার জমিদার বাড়ি বললে, প্রায় দু-শো বছরের পুরানো। একসময় এই বাড়ি ছিল  স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্র যেখানে জমিদাররা বসে বিচার করতেন,  উৎসব করতেন এবং  সংস্কৃতির চর্চা করতেন। বাড়ির স্থাপত্যে রয়েছে বেঙ্গল রেনেসাঁর ছোয়া, পোড়ামাটির অলঙ্করণ এবং কাঠের কারুকাজ।  স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিলে জানা যায় এই জমিদার বাড়িতে এককালে কবি ও শিল্পীদের সমাবেশ হত। বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন সেই সব ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলেছে।  তাই এই জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি  ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। একদিনের এই সফর একটি বাজেট ফ্রেন্ডলি সফর যা কিনা মোটামুটি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে সেরে ফেলতে পারবেন।  এ সফর নিরাপদ আর সহজেই আপনি জমিদার বাড়ি পৌঁচ্ছাতে পারবেন। তার সাথে আপনি সন্তুষ্টি পাবেন পুরোনো স্থাপত্য দেখে যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক গল্প ও সংস্কৃতির নির্দশন। এছাড়া এটুকু জোর দিয়ে বলা যায় যে এই অজ গ্রামের মধ্যে যতক্ষন আপনি জমিদার বাড়িতে থাকবেন  ততক্ষণ আপনি পাবেন এক অপার শান্তি। একবেলার সফর অবশ্যই আপনার সার্থক হবে।

             

           ****$$  সংগৃহীত    $$****

                     ****&&&&&&****




No comments:

Post a Comment