Sunday, 18 October 2026

অযোধ্যা গ্রামের বোনেদি দুর্গাপুজো

 




একবেলার ছোট্ট এক সফরে চলুন দেখে আসি পুরানো দিনের সেই বোনেদি দুর্গাপুজো। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে উনিশ শতকের পরাধীন ভারতে বাংলার দুর্গাপুজো মানেই ছিল জমিদার বা রাজবাড়ির পুজো। সেই সব পুজোর মধ্যে কিছু ছিল বেশ নাম করা। সেগুলির মধ্যেই অন্যতম বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর ব্লকের দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে প্রাচীন বর্ধিষ্ঞু অযোধ্যা গ্রামের জমিদার বাড়ির পূজো। হ্যাঁ, তবে আগে যে জাকজমক ছিল  তা আর এখন নেই।  আর্থিক অনটনই এর অন্যতম কারণ।  তাই তখনকার দিনের মতন আয়োজন সম্ভব হয় না। তবে জৌলুসে খামতি থাকলেও আগেকার সব নিয়ম মেনেই আজ এই পুজো চলে আসছে। 




আরও দেখা যাবে এই  বংশের পূর্ব পুরুষ হরি বন্দোপাধ্যায় ১৬৪৫ সাল নাগাদ  অযোধ্যায় আসেন। ইনিই অযোধ্যা বসবাসকারী সমস্ত বন্দোপাধ্যায় বংশীয়দের আদি পুরুষ। তখন কিন্ত ইনাদের কোনও জমিদার  ছিল না।  হরি বন্দোপাধ্যায়ের অধস্তন চতুর্থ পুরুষ ছিলেন নিমাই চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। তার চার পুত্র ও এক কন্যা ছিল। ছেলেদের নাম....কৃষ্ণমোহন,  লালমোহন, রামমোহন  ও গদাধর।  কন্যার নাম ছিল  সখিমনি। রামমোহন চাকরির খোঁজে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে করতে হুগলির শ্রীরামপুরে আসেন এবং সেখানে চিক নামের এক নীলকর সাহেবের সাধারণ কর্মচারী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। নিজের সততা,  বুদ্ধিমত্তা, কর্ম তৎপরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় সাহেবের অত্যন্ত প্রিয়জন ও স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন।সাহেব তাঁকে দেওয়ান পদ দেন। কিছুদিন পর ঐ নীলকর সাহেব তখনকার দিনের এক দূরারোগ্য ব্যাধি কলেরাতে আক্রান্ত হন।  আশেপাশের সব মানুষজন ভয়ে তাঁকে রেখে পালিয়ে যান। কিন্ত রামমোহন বাবু তাকে সেবা শুশ্রুসা করার জন্য তার পাশেই থাকেন এবং বিশ্বস্ততার ও সততার পরিচয় দেন।  তখন সাহেব তার ভারতের সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক রামমোহনকে এবং বাকি অর্ধেক সম্পত্তি তার লন্ডনের বসবাসকারী স্ত্রীকে ভারতে এলে দিয়ে দিতে বলেন। তাই নীলকর সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর কথামত রামমোহন বাবু অর্ধেক সম্পত্তি সাহেবের স্ত্রীকে দেন বাকি অর্ধেক সম্পত্তি নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে আসেন।  এই সময় থেকেই বন্দোপাধ্যায় পরিবারের জমিদারি শুরু হয়।




একসময় জমিদারির দাপট ব্যাপক হয়ে উঠে। রামমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বৈভব ও দাপট বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এক কথায় বলা যায় এই সময়কাল  বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদারদের স্বর্ণযুগ। ১০৮ জন লাঠিয়াল সব সময় পাহারা দিত জমিদার বাড়ি ও জমিদারদের।  রামমোহন বন্দোপাধ্যায় সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছিলেন ২২ খানা নীলকুঠি । তাদের  জমিদারি ছিল  অযোধ্যার প্রায় ৮৫টি মৌজায়। এছাড়াও তালডাংরা, বড়জোড়া ছিল এই জমিদারদের অধীনে। খাজনা আদায় করে আনা হত হাতির পিঠে করে। হাতি প্রবেশের জন্য তৈরী করা হয়েছিল বিরাট এক সিংহ দুয়ার। লোকেরা একে বড়ো ফটক বলত। খাজনা আদায় করে রাখা হতো আটচালায়। সেখানে আলাদা করা হত সোনা, রুপা , তামা, কাসাঁ ও পেতল । সেগুলি ঝুড়িতে করে আলাদা আলাদা করে নিয়ে গিয়ে রাখা হত কোষাগারে। আগে বিষ্ণুপুর রাজাদের কামানের গর্জন শুনে অষ্টমীর সন্ধিক্ষনে চালকুমড়ো বলি হত । তবে এখন পুঁজির সময় অনুসারে হয়ে থাকে। জমিদারীর বাড়বাড়ন্ত হয় এই রামমোহনের আমলেই।  পরবর্তীকালে গদাধর বন্দোপাধ্যায়ের আমলে জমিদারি আরও উন্নতি হয়।  জমিদারির এই অভূতপূর্ব উন্নতির জন্য   এবং জনকল্যান কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার  গদাধর বন্দোপাধ্যায়কে  " রায় বাহাদুর " উপাধিতে ভূষিত করেন। অযোধ্যার জমিদারের এই পদবী লাভ সে যুগে ওই অঞ্চলে তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক মস্ত বড় স্বীকৃতি ছিল।









সিংহদ্বার দিয়ে ঢুকে বামদিকে দেখতে পাবেন দ্বাদশ শিব মন্দির।  সিংহদ্বার লাগোয়া সমউচ্চতায় রয়েছে নহবতখানা। জমিদার বাড়ির যে কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানে এখানে সানাই-এর আসর বসতো। আজ সেই প্রায় ধ্বংসের মুখে। সিংহদ্বারের ডান পাশে রাখা আছে ১৮৬৭ সালে নির্মিত ৮ ফুট উচ্চতার পিতলের রথ। এখনও এই রথ রাস্তায় বার হয়। এবার সামনের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন গিরিগোবর্ধন মন্দির, দোল মন্দির,  রাস মন্দির।  পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে এই চার সহোদর ভাই তাঁদের মা রঙ্গিমনির নামে রাসমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রতি দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ ফুট ও উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট। এছাড়াও রয়েছে দুর্গামন্দির, নাটমন্দির ও তাঁদের কুলদেবতা রাধাদামোদরজিউ-এর মন্দির।  রাধামাধবজিউ মন্দিরে রয়েছে দুটি শালগ্রাম শিলা। বড়টির নাম বংশীগোপালজিউ এবং ছোটটির নাম রাধাদামোদরজিউ। ইনাদের নিত্য সেবা হয় এবং অন্ন ভোগ দেওয়া হয়। পূজো শেষ হলে বারটি শিবের পূজো আরম্ভ হয়। গিরিগোবর্ধন মন্দিরটি ১৮৩৫ সালে নির্মিত হয়েছিল। কৃষ্ণের গিরিগোবর্ধন ধারণের সুপরিচিত কাহিনীর অনুসরণে এই  দেবগৃহ। এই  মন্দিরটি অভিনব  শিল্পের নিদর্শন রাখে।মন্দিরটি উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট ও দৈর্ঘ্যগ্রন্থে ১৫ ফুট। সত্যিই এটি দেখবার মতন। গিরিগোবর্ধনের পূজো বছরে একদিন হয়। কালীপুজোর পরের দিন মন্দির খুলে পূজো করা হয়। এছাড়া সবসময় মন্দির বন্ধই থাকে। তবে অনুরোধ করলে মন্দিরের দরজা খুলে ঠাকুর দেখান জমিদার বংশের কেউ।








ইংরেজ সাহেবের বদন্যাতায় এই ব্যাপক উত্থান হলেও সবসময় দেশের মানুষের পাশেই থাকতেন জমিদার।  ইংরেজদের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের জমিদারিতে তিনি নীল চাষ বন্ধ করেছিলেন।  বাংলার গরীব চাষিদের রক্ষা করতে নীল চাষের পরিবর্তে ধান, সব্জি চাষের নির্দেশ দেন।  সভাবত: ইংরেজদের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু সম্পত্তি হারাতে হয়েছিল। তবুও ইংরেজদের সাথে আপোষ করেননি কখনও। ইংরেজরা  দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সরকার জমিদারি প্রথা বিলাপ করেন। যার ফলে এই বিশাল প্রভাব প্রতিপত্তি আস্তে আস্তে কমতে থাকে। বর্তমানে বেশিরভাগ জমি ও সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর যে টুকু পরে আছে তা দেবোত্তর ট্রাস্টের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ হয়। তাই বন্দোপাধ্যায় জমিদারদের প্রভাব প্রতিপত্তি সেরকম কিছুই আর না থাকলেও তাদের অতীতের ইতিহাস আজও অমলিন।








বন্দোপাধ্যায় পরিবারের বর্তমান সদস্য এবং দুর্গাপুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা জানালেন যে এই পুজো প্রায় ২০০ বছর আগে শুরু করেছিলেন রামমোহন বন্দোপাধ্যায়। তিনি দেবী মূর্তিতে কোনও এক বিশেষত্ব  চেয়েছিলেন।  তাই শ্রীশ্রী চন্ডীমঙ্গলের বর্ণনা অনুযায়ী দেবী সিংহবাহিনী নন, এখানে দেবী  ব্যাঘ্রবাহিনী। তাই বন্দোপাধ্যায় জমিদার বাড়ির দেবী দূর্গা চন্ডীধরি। এখানে প্রতিমার মুখ ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় না। বংশপরম্পরা প্রতিমা শিল্পী হাতে তৈরী করেন প্রতিমার মুখ। তাই প্রতিমাতে রয়েছে এক নজরকারা বিশেষ সাবেকিয়ানা। তিনি আরও দাবি করলেন যে এরকম মূর্তি বাঁকুড়া জেলায় আর দ্বিতীয়টি দেখা  যায় না। এছাড়া বাজনা হিসেবে থাকে ঢোল ও সানাই। এই পুজোতে ঢাক বাজানোর চল নেই।  তবে বর্তমানে সানাই বাদকের অভাব এবং টাকা পয়সার অপ্রতুলতার জন্য সানাই আর হয় না। শুধুমাত্র ঢোল বাজানো হয়।



 তাই দুশো বছরের এই দুর্গাপুজোর জাঁকজমক আগের চাইতে করলেও বন্দোপাধ্যায় বাড়ির ঐতিহ্য এবং রীতি আজও বজায় রয়েছে। আজও প্রাচীন রীতি মেনে পুজো এলেই ভাঁড়ার থেকে বের করে আনা হয় নবপত্রিকা আনার রুপোর ৫০ কে জি র পালকি  ও পূজার যাবতীয় রুপোর বাসন। এই পকলকি করে গ্রামের শেষপ্রান্তের দহঘাট থেকে নবপত্রিকা আনা হয়। বিসর্জন একই ভাবে হয় । পুরো পুজো বৈষ্ণব রীতি মেনে হয়। তাই অষ্টমীতে চালকুমড়ো বলি হয়ে থাকে। পুজো আরম্ভ হবার দিন থেকে যে সব রীতিনীতি পালন করা হত, তা আজও মেনে চলার চেষ্টা করা হয়। খুব জোরেই সঙ্গে জমিদার প্রতিনিধি জানালেন যে ভবিষ্যত প্রজন্মও এই নিয়ম কানুন ধরে রাখার চেষ্টা করবে। 




অযোধ্যা গ্রাম মাকুড়গ্রাম- জয়কৃষ্ঞপুর সড়কের পাশেই অবস্থিত।  সড়ক পথে বিষ্ণুপুর থেকে অযোধ্যার দূরত্ব ১৩.৭ কি মি। আর বাঁকুড়ার দূরত্ব ৩২.৯ কি মি.। জয়কৃষ্নপুর মোড় থেকে অযোধ্যা ৫.৫ কি মি দূরত্বে রয়েছে। আর যদি রেলে আসতে চান তবে নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হ'ল বিষ্ণুপুর  যা অযোধ্যা থেকে ১৭ কি মি দূরে।






অযোধ্যা গ্রামের এই বন্দোপাধ্যায় জমিদার বাড়ি অর্থাত সহজে চেনা যায় বাঁকুড়ার জমিদার বাড়ি বললে, প্রায় দু-শো বছরের পুরানো। একসময় এই বাড়ি ছিল  স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্র যেখানে জমিদাররা বসে বিচার করতেন,  উৎসব করতেন এবং  সংস্কৃতির চর্চা করতেন। বাড়ির স্থাপত্যে রয়েছে বেঙ্গল রেনেসাঁর ছোয়া, পোড়ামাটির অলঙ্করণ এবং কাঠের কারুকাজ।  স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিলে জানা যায় এই জমিদার বাড়িতে এককালে কবি ও শিল্পীদের সমাবেশ হত। বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন সেই সব ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলেছে।  তাই এই জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি  ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। একদিনের এই সফর একটি বাজেট ফ্রেন্ডলি সফর যা কিনা মোটামুটি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে সেরে ফেলতে পারবেন।  এ সফর নিরাপদ আর সহজেই আপনি জমিদার বাড়ি পৌঁচ্ছাতে পারবেন। তার সাথে আপনি সন্তুষ্টি পাবেন পুরোনো স্থাপত্য দেখে যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক গল্প ও সংস্কৃতির নির্দশন। এছাড়া এটুকু জোর দিয়ে বলা যায় যে এই অজ গ্রামের মধ্যে যতক্ষন আপনি জমিদার বাড়িতে থাকবেন  ততক্ষণ আপনি পাবেন এক অপার শান্তি। একবেলার সফর অবশ্যই আপনার সার্থক হবে।

             

           ****$$  সংগৃহীত    $$****

                     ****&&&&&&****




Tuesday, 3 October 2023

স্থাপত্যের উজ্জ্বলতা---- জটিলেশ্বর শিবমন্দির

 


অনাবিষ্কৃতপ্রায় , ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বাহক ময়নাগুড়ির জটিলেশ্বর শিব মন্দির। 

মন্দিরের প্রধান গেট


মন্দিরের সন্মুখভাগ 


উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ব্লকে সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী অনেকগুলি মন্দির রয়েছে। এই তীর্থ ক্ষেত্রগুলির "জল্পেশ মন্দির " এবং " জটিলেশ্বর মন্দির " ভারত বিখ্যাত।  ময়নাগুড়ি থেকে প্রায় ১১ কিমি দূরে চুরাভান্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন মল্লিকহাট এলাকায় রয়েছে জটিলেশ্বর মন্দির।  তবে এই মন্দির কে গড়েছিলেন বা কবে তা তৈরি হয়েছিল তা আজও এক রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা রয়েছে। 


বাবা জটিলেশ্বর 


ইতিহাস ঘাটলে মন্দির নির্মাণ সম্পর্কে যে সব তথ্য জানা যায় সেগুলি এই রকম। একদল গবেষক তাদের গবেষণার পর সিদ্ধান্তে এসেছেন যে এটি পাল যুগে তৈরি হয়েছিল।  অন্য গবেষক দল জানিয়েছেন মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল পালযুগের অনেক আগে অর্থাৎ  গুপ্তযুগের আমলে। আবার প্রত্নতত্ত্ববিদরা  প্রত্নতত্তিক উপাদান নিয়ে  গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে এই মন্দিরের বয়স কমপক্ষে  হাজার বছরেরও বেশি। কিংবদন্তিতে যাদের বিশ্বাস তাঁরা বলে থাকেন যে এই মন্দির ৩২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তৈরী হয়েছিল।  সময়ের কারনে মন্দিরের দেওয়াল বারবার সংস্কারের ফলে মন্দিরের পুরানো ঐতিহ্য অনেকটাই মুছে গিয়েছে। তবু আজও এই মন্দির সেই পুরোনো দিনের মতই জটাজুটধারী শিবের উপাসনাস্থল হিসেবেই ভক্তদের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিত। 




মন্দির এলাকায় বিভিন্ন পাথরের মূর্তি



গুপ্ত রাজবংশের দ্বারা নির্মিত হওয়ায় এই মন্দির বহু পুরানো ও বলা যেতে পারে উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এইজন্য এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের আধিক্য রয়েছে। বলা যেতে পারে ভারতের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের স্বতন্ত্রের প্রতীক।  মন্দিরটি পাথর ও মাটির ইট ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছিল।  যদিও এটি ভগবান শিবের মন্দির,  মন্দিরের দেওয়াল গুলিতে অন্যান্য হিন্দু দেবতার মূর্তি দিয়ে ভাস্কর্য করা হয়েছে। পাশেই রয়েছে লক্ষী-নারায়ন মন্দির।  আর রয়েছে মা কালীর মন্দির।  মন্দির এলাকায় প্রবেশের জন্য দর্শক প্রতি ৫ টাকা করে টিকিট কাটতে হয়। তবে একবার ভিতরে ঢুকলে পরে ঐ এলাকা জুড়ে এক শান্তির ছায়া পাবেন এবং ইচ্ছা হবে বট গাছের তলায় বসে কিছুটা সময় কাটাতে পারলে ভালো হতো।




জলঢাকা নদী বয়ে চলেছে এই মন্দিরের খুব কাছ দিয়ে। মন্দির ঠিক কতটা প্রাচীন এই তর্কে অংশ গ্রহণ না করে ভক্তরা আসেন জটিলেশ্বর মন্দিরে তাদের যাবতীয় কষ্ট থেকে মুক্তি পাবার জন্য।  এই মন্দির অত্যন্ত জাগ্রত....... এটাই ভক্তদের গভীর বিশ্বাস।  আর এই মন্দিরের দেবতা  বাবা জটিলেশ্বর তার ভক্তদের খালিহাতে ফেরান না। ভোলানাথের কৃপায় এই মন্দিরে এসে বাবার কাছে চাইলে সে যতই কঠিন ও জটিল সমস্যাই হোক না কেন,  ভক্তরা তা থেকে মুক্তি পান। এই বিশ্বাসের উপর ভর করে দেখা যায় যে বহু ভক্তই এখানে আসছেন বংশ পরম্পরায়। 



বাগডোগরা বিমানবন্দর এখান থেকে ৮৫ কি মি। সেখান থেকে ভাড়ার গাড়িতে এখানে চলে আসতে পারেন।  রেলে আসতে গেলে নিউ ময়নাগুড়ি ষ্টেশন থেকে ১৪ কি মি দূরে এই মন্দির।  সঢ়কপথে ময়নাগুড়িতে এসে সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সি করে হুসলুরডাঙ্গা চলে আসুন।  আর সেখান থেকে আরামে সহজে পৌচ্ছে যান মন্দিরে।

মা কালীর মূর্তি

প্রাচীন বটগাছে মানত করা


মন্দিরের দেওয়ালে পাথরের মূর্তি


জটিলেশ্বর মন্দিরকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছে পর্যটন দফতর।  রাজ্য পর্যটন দফতর চায়, ইতিহাস সমৃদ্ধ এই এলাকাটি সাধারণ পর্যটকের কাছে তুলে ধরতে। সেজন্য " ডুয়ার্স মেগা ট্যুরিস্ট " প্রকল্পের অধীনে এই মন্দির এনে ,পুরোনো কাঠামো অক্ষত রেখেই, পর্যটন মন্ত্রকের আর্থিক সহযোগিতায় মন্দির চত্বর ঢেলে সাজনো হচ্ছে। এমনিতেই ময়নাগুড়ি খুব সুন্দর জায়গা। এক দিকে তিস্তা আর এক দিকে জলঢাকা। পাশেই গরুমারা। ভ্রমনার্থীদের সুবিধার জন্য নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশন থেকেই বাস পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে পর্যটন দফতর। এসব পরিকল্পনা সফল হলে তখন বলা যাবে ডুয়ার্স বলতে শুধুই  জঙ্গল বা চা বাগান  বা নির্সগতা  বোঝায় না, ডুয়ার্স বলতে সুপ্রাচীন এক সভ্যতার নিদর্শন। 





Sunday, 17 September 2023

জলমগ্ন মঙ্গলের প্রতিক--- জল্পেশ্বর শিব

 


ময়নাগুড়ির জল্পেশ মন্দিরে জল্পেশ্বর শিব 

উত্তরবঙ্গের নামী শিবমন্দিরগুলির অন্যতম জল্পেশ।  ভগবান শিবের প্রাচীন মন্দির।  এই মন্দিরের প্রধান দেবতা  "জল্পেশ্বর" অর্থাৎ ভগবান শিবের একটি রুপ। এই ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যমন্ভিত মন্দিরটি জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি থেকে আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।  পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জরদা নদী। এখানে শিবলিঙ্গ হল জল লিঙ্গ।  অর্থাৎ শিবলিঙ্গ এখানে গর্তের মধ্যে জলের ভিতর থাকেন যাকে বলা হয় জল লিঙ্গ  বা অনাদি। গর্তে জল ঢেলে পূন্য অর্জন করতে হয়। কথিত আছে এই মন্দির ভ্রামরী শক্তিপীঠের সঙ্গে জড়িত। জলেশ্বর হলেন দেবী ভ্রামরীর ভৈরব। মন্দিরটি মনোরম স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। পুরাণ অনুযায়ী , এই মন্দির হাজার বছরেরও বেশী পূরানো। অনেকেই বলেন , দিল্লির মুসলমান স্থপতিরা এই মন্দির তৈরি করেন বলে মন্দিরের চূড়া গম্বুজাকৃতি। মন্দিরটি ১২৪ ফুট দীর্ঘ,  ১২০ ফুট চওড়া আর উচ্চতা ১২৭ ফুট। মন্দিরে নারায়ণ,  কালী, কুবেশ্বর এবং ভ্রামরী দেবীর মূর্তিও  আছে। মন্দির কমিটি ভক্তদের কাছ থেকে কুড়ি টাকা ( সাধারণ) থেকে একশো টাকা ( স্পেশাল ) টিকিট বাবদ নিয়ে থাকেন।  তা দিয়ে মন্দিরের বিভিন্ন সময়ে নানা সংস্কার হয়ে থাকে। এই মন্দিরে ৭ জন পুরোহিত  ও ৩০ জন কর্মচারী আছেন। প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয় তাদের বেতন বাবদ। ট্রাষ্টি বোর্ডের কর্মকর্তা জানালেন মন্দিরের এসব খরচের টাকা বেশিরভাগ মেলার সময় রোজগার হয়। এছাড়া  বহু লোক প্রচুর দান করেন। আর টিকিট বিক্রির  টাকা দিয়ে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ চলে।  মহাশিবরাত্রিতে ও শ্রাবন মাসে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীর ভিড় হয়।  অনেকেই মানত করে তিস্তা থেকে হেঁটে হেঁটে কাধে বাক নিয়ে মন্দিরে পৌচ্ছায়। শিবলিঙ্গে জল নিবেদনের ঐতিহ্য একটি প্রাচীন রীতি যা আজও অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাসের সাথে অনুসরণ করা হয়।



জল্পেশ মন্দির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম শৈব তীর্থ। এই শৈবক্ষেত্রে জনপ্লাবন দেখতে হলে আপনাকে আসতে হবে শিবরাত্রির সময় বা শ্রাবন মাসে। লোকপুরান বা লোকবিশ্বাসকে যদি আপনি আলোচনা করেন তবে দেখা যায় যে প্রাচীন সিল্ক রুট বা রেশম পথের উপর গড়ে উঠেছিল এই জল্পেশ মন্দির।  আদি নাম গড়তলি। জল্পেশের উল্লেখ আছে কালিকাপুরান বা স্কন্দপুরানে। প্রচলিত বিশ্বাস , প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা জল্প অথবা জল্পেশ এখানে মন্দির তৈরি করেন। তার নামেই নামকরন হয় এই মন্দিরের।  তবে এই বিশ্বাসের কোনো প্রমাণ নেই। আবার পুরোনো গল্প কাহিনী থেকে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর অসমের রানী ময়নামতি  জল্পেশের কর্পূর জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন।  সেখানে সাধু ছদ্মবেশে সেনাপতি হানা দিলে যুদ্ধ হয়। সেনাপতি মারা যান।  পরবর্তীতে তিনি ধোওলা ঠাকুর নামে দেবায়িত হন। মন্দিরের পাশে সেই থান  রয়েছে। তবে এই বিশ্বাসেরও ঐতিহাসিক তথ্য তেমন মেলে না। 


ইতিহাস ঘাটাঘাটি করলে দেখা যায় যে  শ্রী বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ সালে জল্পেশ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ইনি ছিলেন কোচবিহার মহারাজা নরনারায়নের পিতা। পরবর্তীকালে ১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।  আবার ১০০ বছর পরে রাজা প্রান নারায়ণ ১৬৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর কোচবিহারের রাজা লক্ষী নারায়ণের রাজত্ব কালে কোচ রাজবংশের বশ্যতা অস্বীকার করার পর, মহাদেব রায়কত তার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কোচ রাজাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে অস্বীকার করেন।  এরপর থেকে মন্দিরটি বৈকুন্ঠপুরের রায়কতদের তত্ত্বাবধানে ছিল।  ১৮৯৯ সালের ৩০ শে জানুয়ারি রাজা গজেন্দ্র দেব রায়কতের স্ত্রী রানী জগদেশ্বরী দেবী এর  পুনপ্রতিষ্ঠা করেন। "মহাশিবরাত্রী" এই মন্দিরটির উদযাপনের প্রধান উৎশব। এছাড়া শিবের কাছে বিশেষ পূজা করার জন্য আগষ্ট মাসে শ্রাবনী মেলায় প্রচুর তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়ে থাকে। 





সপ্তদশ শতকে মন্দির তৈরির পর থেকেই এখানে শিবরাত্রিতে বিখ্যাত মেলার সূচনা। সেই দিক থেকে মেলাটি গোটা রাজ্যেরই প্রাচীন মেলাগুলির অন্যতম। ডুয়ার্স যখন ভুটানের অংশ ছিল, তখন ময়নাগুরিকে কেন্দ্র করেই পাহাড় ও সমতলের ব্যবসা হত। ফলে এই মেলার বানিজ্যিক গুরুত্ব ছিল  অসীম। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা হওয়ার আগে এখানে হাতি বিক্রি হত।  নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ ও অন্যান্য নিকটবর্তী রাজ্যের লোকেরা এখানে মেলায় আসে। 



শিব উপাসকদের কাছে এই মহাশিবরাত্রি এক বিশেষ দিন। শিব ও শক্তির মহামিলনকে কেন্দ্র করেই উদযাপনের হয় শিবরাত্রি। মন্দিরের ভিতরে " ওঁম শিবায় নম: " ধ্বনিতে মেতে থাকে চার প্রহর। স্থানীয় লোকজন এই উদযাপনকে শুভ ও সমৃদ্ধির বাহক বলে বিশ্বাস করে। এক মাস ব্যাপী এই মেলায় যে রেকর্ড ভীর হয়, তা চরম জনপ্রিয়তাকেই প্রমান করে। শুধু স্থানীয় লোকজনই নয়, ভারতের দূরদূরান্তের মানুষও এই মেলায় অংশ নিতে আসে। এই মেলার উপর প্রচুর মানুষের রুটি রোজগার নির্ভর করে। দেখাযায় বছরের প্রায় ছয় মাসের রোজগার এই মেলা থেকে হয়ে থাকে। তবে শিবরাত্রির পাশাপাশি শ্রাবন মাসেও এখানে ভিড় করেন ভক্তের দল। স্থানীয় লোকেরা এই মেলাকে শ্রাবনী মেলা হিসেবেই চেনে। সেই সময় " হর হর মহাদেব " ধ্বনিতে মুখরিত হয় মন্দির ও মেলা চত্বর।  দুটি মেলাই বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে তাদের জাতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতি নির্বিশেষে একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।