বনকাপাসি ! শোলার সাজের গ্রাম বনকাপাসি। গ্রামের নামটা হয়ত অনেকেই প্রথম শুনছেন। তা তো হতেই পারে। আমাদের ভারতবর্ষে তো কতই গ্রাম রয়েছে। সব গ্রামের নাম তো মনে রাখা সম্ভব নয়। তবে এ গ্রামের নাম শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, শুধু ভারতবর্ষে নয়, ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্বে । বিশ্বের সব থেকে বড় শোলা শিল্প গ্রামের তকমা পেয়েছে এই গ্রাম। তাই সবাই এই গ্রামকে " শোলা শিল্প গ্রাম " নামে একডাকে চেনে।
পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমার মঙ্গলকোট ব্লকের অন্তর্গত শোলা সামগ্রি নির্মাতাদের এই গ্রাম বনকাপাসি। বর্ধমান-কাটোয়ার রোডের পাশেই এই গ্রাম। প্রায় একশো বছরেরও বেশি পুরোনো এই শিল্পকে ধরে রেখেছে এই গ্রাম। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প যা শুধু ভারতবর্ষ কেন সারা বিশ্বে সমাদৃত। তাই এই গ্রামের পরিচিতি " শোলা শিল্প গ্রাম " বা " শোলার সাজের গ্রাম " হিসেবেও। বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং তাদের সাথে যুক্ত হাজারেরও বেশি কারিগর এই কাজে যুক্ত। এইসব কর্মী বা গোষ্ঠীদের উৎসাহিত করতে রাজ্য সরকার এই গ্রামটিকে " শোলা হাব " হিসেবে ঘোষনা করেছেন। ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্প ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করার লক্ষ্যে সভাবত: এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
শোলা জিনিসটা কি ? শোলা হল একরকম জলজ উদ্ভিদ। শোলা গাছের ছাল থেকে তৈরি শুকনো দুধের মতো সাদা স্পঞ্জি পদার্থ। এর বৈজ্ঞানিক নাম " এস্কাইনোমিনি অ্যাস্পেরা " । মূলত এটি একটি বর্ষাজাত উদ্ভিদ। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এই গাছ খুবই পবিত্র। সে কারণেই যে কোনো শুভ কাজে ব্যবহৃত হয় এই শোলা। বিশেষ করে দেব-দেবীর অলঙ্কার, মালা, মুকুট , আবার বরের টোপর ইত্যাদির মতো জিনিস তৈরী করা হয়। দেব-দেবীর সাজ সজ্জা থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন সাজার জিনিস সবই তৈরি হয় এই শোলা দিয়ে। আগেকার দিনে এই সাজকে ডাকের সাজ বলা হতো। কেনই বা এইরকম নাম হয়েছিল দেবতাদের পোশাকের। লোকমুখের এই নাম খুবই পরিচিত এবং জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার পিছনের ইতিহাস এই রকম...... বেশ কিছুকাল আগের কাগজপত্র ঘাটলে দেখতে পাবো, আগেকার দিনে দেবী দুর্গার অলঙ্কার তৈরী করা হত পেটানো রুপোর পাত দিয়ে। এই রকম পাত আসতো জার্মানি থেকে ডাকে। এই কারনে এর নাম হয়েছে ডাকের সাজ। কিন্ত এই প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে। এই সাজ তখন থেকে দখল করে নেয় শোলার সাজ। এক টুকরো শোলা। এর সাথে সঙ্গী হয় শিল্পীমন, শিল্পীর দুই হাত আর নানা মাপের চাকু। ছুরি দিয়ে কেটে তাতেই ফুটে উঠছে অমূল্য এক শিল্প কর্ম। দেব-দেবী , মনিষীদের অবয়ব থেকে বিভিন্ন কারুকার্যের অপূর্ব শিল্পকলা। এই গ্রামের শোলা শিল্প দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পারি দিচ্ছে আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নরওয়ে বা এডেনবরা সহ বিভিন্ন দেশে।
এখন প্রশ্ন হল কেন দেব-দেবীর সাজ পোশাক, অলঙ্কার, মালা, মুকুট হিসেবে বেশী ব্যবহৃত হয়। একটু যদি পুরাণ নিয়ে ঘাটাঘাটি করি তবে দেখতে পাবো পার্বতীকে বিয়ে করার সময় শিবের নাকি সাদা টোপর পরার বাসনা হয়। সেই সময় দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার কথায় টোপর তৈরির উপাদান হিসেবেই শোলার জন্ম দেন স্বয়ং শিব। একই সাথে তিনি জলাশয়ের সৃষ্টি করেন। সেই জলাশয়ে শোলা জন্মালে এক সুকুমার যুবকের প্রচেষ্টায় হরগৌরির বিয়ের টোপর, মুকুট, মালা তৈরি হয়। এই কাজে সকলে মুগ্ধ হন। তখন তার নামকরন হয় মালাকার । আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এই মালাকারই শোলা শিল্পের ধারক ও বাহক। তবে বর্তমানে অনেক সম্প্রদায়ের মানুষ জীবিকার সন্ধানে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী শ্রী আশীষ মালাকারের বাড়ি ও তার সব কর্মকান্ড এই বনকাপাশি গ্রামেই। তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯০ সালে আর শিল্পগুরু পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৭ সালে। আশীষবাবু জানালেন তাঁর ঠাকুরদা শ্রী মৃত্যুঞ্জয় মালাকারের এক দোকান ছিল কুমারটুলিতে। ইনার স্ত্রী অর্থাৎ আশীষবাবুর ঠাকুমা শ্রীমতি কাত্যায়নী দেবীও শোলার কাজে খুব পটু ছিলেন। ঠাকুমা রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে। ঠাকুমা সব সময় শোলার কাজে ঠাকুরদাকে সাহায্য করতেন। মৃত্যুঞ্জয় মালাকারের শোলার কাজ দেখে নেতাজী মুগ্ধ হয়েছিলেন। নেতাজীর অনুরোধে মৃত্যুঞ্জয় মালাকার নেতাজীর বাড়িতে কালীঠাকুর সাজিয়েছিলেন। আশীষ বাবুর বাবা আদিত্য মালাকার এই শিল্প- কাজের ধারা বজায় রেখেছিলেন। কুমারটুলির দোকানের ব্যপারে কিছু অসুবিধা হওয়াতে মৃত্যুঞ্জয় বাবু সপরিবারে এই বনকাপাশি গ্রামে চলে আসেন। আশীষ বাবুর কাজ শেখা তাঁর বাবার কাছ থেকে। আদিত্য বাবু রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পান ১৯৭৪ সালে। আশীষ বাবু দেশের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহন করেন। এই কাজ নিয়ে তিনি বিদেশের প্রায় আটটি দেশ ঘুরে এসেছেন। তার বাবা অনেক বেশি বার বিদেশে গিয়েছেন। তাই বাংলায় শোলা শিল্পের এই ব্যাপক উন্নতির জন্য এই পরিবারের অবদান অনেক। বিশ্বমঞ্চে শোলা শিল্পের পরিচিতি বা শোলা শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছেন এই পরিবারই ।
প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ বছর আগে বনকাপাসিতে শোলার কাজের সূত্রপাত হয়েছিল। সে সময় অবশ্য আজকের মতো বড়ো আকারের কারখানা বা বৈচিত্র্যপূর্ন কাজ ছিল না। কলকা বা ঠাকুরের ডাকের সাজ সহ অল্প কিছু সামগ্রী তৈরি করেই চলত এই শিল্প। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এই কাজের পরিধি বাড়ে। প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে বনকাপাসিতে শোলার কাজ অনেক বেশি বিস্তৃত হতে শুরু করে। একটি পরিবার থেকে ক্রমে বহু পরিবার এই পেশায় যুক্ত হয়। এখন বনকাপাশির ৯০শতাংশ মানুষই এই শিল্পের সাথে জড়িত। সারা বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার উপর কাজ হয় এই শিল্প গ্রামে। কুটির শিল্পের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এই শিল্প বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পরে। দেব-দেবীর সাজ সজ্জায় " ডাকের সাজ " সারা বিশ্বের সামনে বনকাপাশিকে তুলে ধরে। এ সবের পরিচিতি বিভিন্ন নথি ও তৎকালীন অনেক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
দেব-দেবীর পুজোর সময় তাঁদের সাজ সজ্জা, মালা, মুকুট, অলঙ্কার সবই দরকার পরে। আমরা যেমন পুজোর কেনাকাটা জন্য শপিং মলে যায় , ঠিক সেইরকম দেব-দেবীর সব কিছু কিনতে হলে পশ্চিমবঙ্গের দেব-দেবীর শপিং মল বনকাপাসিতে যেতে হয়। এছাড়া হিন্দু বিবাহের শুভ কাজে টোপরের এর যোগান এই বনকাপাশিই দিয়ে থাকে। আবার গ্রাম বাংলায় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যখন কোনো শিশুর জন্ম হয়, তখন তার জন্ম উদযাপন করতে ষষ্ঠী পুজো অনুষ্ঠিত করতে হয়। একটি ছোট্ট চাঁদমালা, শোলার তিনটি সূক্ষ্ম নকশার গোলাকার থালা একসাথে বেধে খারা ভাবে ঝুলিয়ে ...... অর্পণ করা হয়। আবার যখন কেউ মারা যায় , তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর, শোলার একটি ছোট ভেলা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাই হিন্দুদের কাছে শোলা জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু তিন সময়ই দরকার হয়। তবে যাই হোক এখন আর এই শোলার কাজ শুধুমাত্র দেব-দেবীর সাজ পোশাক বা বিয়ের মাথার টোপরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন ঐ জায়গা থেকে ফ্যাশন শো এর RAMP পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি শোলার সাজ মালয়েশিয়ার ফ্যাশন শো তে বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে দিল এই বনকাপাশি।ফ্যাশন শো তে শোলার সাজে অংশ গ্রহন করেছিলেন বেহালার এক তরুণী। চমকে দিয়েছেন তিনি। সারা শরীরে ছিল শোলার পোশাক। তাঁর এই শোলার পোশাকের ডিজাইন দিয়েছেন এবং পোশাক তৈরী করেছেন বনকাপাশির রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী শ্রী আশীষ মালাকার।
আপনি যদি সড়কপথে নিজের গাড়ি নিয়ে যেতে চান তবে State Highway 14 অর্থাত বর্ধমান-কাটোয়া রোডের পাশেই এই গ্রাম। আর ট্রেনে যেতে চান তবে বর্ধমান-কাটোয়া লাইনে বনকাপাশি ষ্টেশন রয়েছে। বনকাপাশি ষ্টেশনে নেমে অটো বা টোটো করে বনকাপাশি গ্রামে পৌচ্ছে যান। বর্ধমান ষ্টেশন থেকে এই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৪৬ কি মি। ভাতার থেকে এর দূরত্ব ২৮ কি মি। আর কাটোয়া রয়েছে এর থেকে ১৫ কি মি দূরে।
এখানে ( বনকাপাশিতে) সরল নকশার কাজ বেশি হয়ে থাকে। তবে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী যে কোনো কাজ এখানকার শিল্পীরা করে দিতে পারেন। এই বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী বলে চন্দননগর বা যে কোনো পূজো কমিটি থেকে দেওয়া যে কোনো কাজ বা নকশা শিল্পীরা অনায়াসে করে দিতে পারেন। এখন অবশ্য পুরোনো ধারার কাজের সাথে আধুনিক এবং নতুন ধরনের কাজ সংমিশ্রন হয়ে চলেছে। তাই এই শিল্প এখন নতুন ও পুরাতনের মিশ্রণ। পুজোর সময় কাজের জোয়ার এলেও সারা বছর ধরে আগে যেমন কাজের চাহিদা ছিল তেমন আর নেই। কাজের চাহিদায় অনেক ভাটা পরেছে যা কিনা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এক চাপ সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও রয়েছে কাঁচামাল অর্থাত শোলা যোগানের অভাব। আগে শোলার চাষ হত বনকাপাশিতেই। কিন্ত জলাশয়ের অভাবে সেই চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শোলা আনতে হয় দক্ষিণবঙ্গ থেকে । পরিবহন খরচা অনেক বেড়ে গেছে। তার উপর রয়েছে পুলিশের জুলুমবাজি। যে শোলার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, সেই শোলার দাম বেড়ে দাড়িয়েছে ৪০০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা। এছাড়াও রয়েছে অসাধু লোকের ঠকবাজি। তাই তরুনদের মধ্যে অনেকেই এই কাজ ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে অন্য কাজে চলে যাচ্ছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে বলতে হচ্ছে বনকাপাশির ঐতিহ্যবাহী শিল্প বাংলার সংস্কৃতিক পরিচয়ের এক বিরাট অংশ। ঠিক আবার অন্য দিকে বলতে হয়, নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে ধরে রাখাও এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। যদিও প্রবীনেরা সেই আগের মতোই আনন্দে আর উৎসাহে তাদের শিল্প কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন । তাদের দৃড়তা এই ভেবে যে শোলা শিল্পটাই হল ...... ঈশ্বরের কাজ। যে কোনো রকম কষ্ট আসুক না কেন আমরা মানিয়ে নিতে পারবো।
$$$*** সংগৃহীত ***$$$














শ্রীমতি কল্পনা মজুমদার জানিয়েছেন......
ReplyDelete👍khoob sundar