Tuesday, 5 July 2022

রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির, দূর্গাপুর

~~দুর্গাপুরের  রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির  ~~

দুর্গাপুরের আড়ায় অবস্থিত রাঢ়েশ্বর মহাদেব মন্দির  আড়া শিব মন্দির নামেও পরিচিত।  দূর্গাপুরে যে বারোটি নামকরা ধর্মীয় স্থান আছে তার মধ্যে এটি একটি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এটি প্রায় ১০০০ বছরের পুরোনো মন্দির।  রাঢ় বংশের মহারাজা বল্লাল সেন কতৃক প্রতিষ্ঠিত।  যেহেতু সেই সময় তাঁর রাজ্য এলাকাকে রাঢ় অঞ্চল বলা হত, তাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিবকে রাঢ়েশ্বর শিব বলা হয়।



এই মন্দিরটি কাঁকসা থানার অন্তর্গত।  রেখ দেউল পদ্ধতিতে পুরোটাই স্থানীয় বেলে পাথর ও ঝামাপাথর দিয়ে তৈরি এই  সপ্তরথ মন্দির।  মাথায় রয়েছে শিখারা যা অন্য কোনো মন্দিরে দেখা যায় না। কিন্ত বেশ কয়েকবার মন্দিরের সংস্কারের দরুন পূর্বের স্থাপত্য রীতি কিছুটা হারিয়ে গেছে। ধর্মীয় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন,  দু দিক থেকেই এর অসীম গুরুত্ব রয়েছে। এখন এটি Archaeological Society Of India অধিগ্রহণ করেছে এবং তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এই মন্দির থেকেই শুরু বিস্তীর্ণ জঙ্গলের।  সেই জঙ্গল অজয় নদীর পাড় পর্য্যন্ত। অবশ্য বড় বড় গাছগুলি কেটে ফেলার ফলে জঙ্গলের ঘনত্ব অনেক কমে গিয়েছে।







লোককথা অনুযায়ী বলা যায় যে রাজা তখন দীর্ঘকাল ধরে এক জটিল রোগে ভুগছিলেন।  যদিও তিনি রাঢ় অঞ্চলের অধিপতি, তবুও তিনি শষ্যাশায়ী। একদিন রাজা স্বপ্নে শিব দর্শন পান। শিবের কাছ থেকে আদেশ পান যে রোগমুক্ত হতে গেলে শিবের নামে মন্দির তৈরি করতে হবে। রাজা তখন শিব মন্দির তৈরি করলেন এবং নাম দিলেন রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির।  সেই থেকে আজও শিবের নিত্য পূজা হয়ে আসছে এই মন্দিরে।



আবার অন্য এক লোককথা এইরকম বলে থাকে............. গোপভূমের রাজাদের মধ্যে অগ্রগন্য ছিলেন ঈশ্বর ঘোষের প্রপিতামহ। সমগ্র রাঢ়ের অধিপতি হওয়ায় তিনি রাঢ়াধিপ বলে পরিচিত ছিলেন।  দুর্গাপুরের রাঢ় গ্রামেই ছিল তাঁর রাজধানী। এই রাঢ়ভূমিই পরে লোকের মুখে মুখে রূপান্তরিত হয়ে আড়া নাম ধারণ করেছে। তিনি তাই নিজের রাজধানী অর্থাৎ বর্তমানের আড়াতেই শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করনে। আর স্বভাবতই রাঢ় দেশে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়াতে মন্দিরের নাম রাখা হয় রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির। 



এই মন্দিরটির কারুকার্য পূর্বভারতের পাথর দিয়ে তৈরি মন্দিরের মধ্যে অন্যতম। মন্দিরটি চন্দ্র ও পাল আমলে প্রচলিত দেউল স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি একটি পীরা দেউল ধরণের গৌড়ীয় স্থাপত্য।





মন্দিরের ভিতরে অর্থাৎ গর্ভগৃহের পরিসর খুব অল্প।  সেখানে পিনাক সমেত বিশালাকৃতির গ্রনাইট পাথরের তৈরি শিবলিঙ্গ একটি কূপের মধ্যে অবস্থান করছেন। শিবলিঙ্গের শৃঙ্গার করেন সেবাইতরা প্রতিদিন সকালে। এটিকে রুদ্র অভিষেক বলা হয়। তারপর পূজা ও আরতি হয়। সারাবছর এখানে ভীড় লেগে থাকলেও শ্রাবন মাসের প্রতি সোমবার পূজো দেওয়া ও শিবের মাথায় জল ঢালার জন্য আগের দিন রাত থেকে লাইন পরে যায়। বেলা যত বাড়তে থাকে , উপচে পড়ে ভক্তদের ভীর।  ভক্তরা  জল ঢালেন এবং অনেকে তার সাথে মানতও করেন।  মানত পূরন হলে পরবর্তীকালে আবার এসে জল ঢালেন। এইসব ভীরের দিন পাঁচ ছয় পুরোহিত মিলে ভীর সামাল দেন।



মহা শিবরাত্রিতে এই মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে।সকাল থেকে মন্দিরে দূর থেকে ভক্তরা আসে। এই দিন এখানে শিব-পার্বতীর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। শিবের বরযাত্রীরা পানাগড়ের বিশ্বকর্মা মন্দির থেকে পানাগড় দার্জিলিং মোড়ে অবস্থিত রাঢ়েশ্বর শিবমন্দিরে আসে ।এখানে শিব-পার্বতীর বিয়ে দেয়া হয়।বরপক্ষ ও কনেপক্ষের জন্য খিচুড়ি ভোগ দেয়া হয়।   মাকুরি সপ্তমীতে এখানে বড় মেলা বসে। যা তিন দিন ধরে চলে। এই মেলা ১০০ বছরের ও বেশি পুরনো। এই  মেলা এলাকার দশটি গ্রামের ঐতিহ্য।








দুর্গাপুর থেকে মুচিপাড়া হয়ে অজয় নদীর দিকে যেতে ৬ কি মি দূরে এই  আড়া গ্রাম। আড়া-শিবপুরের এই  রাস্তার উপরেই অবস্থিত প্রসিদ্ধ প্রাচীন রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির।  রেলপথে বা গাড়িতে দুর্গাপুর এসে টোটো বা অটোর সাহায্য নিয়ে সহজেই এখানে আসা যায়। রাঢ়েশ্বর শিবলিঙ্গ,  প্রস্তর নির্মিত মন্দির ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ দেখে পন্ডিতরা অনুমান করেন যে এই স্থানই সম্ভবত কৃষ্ণ মিশ্র কথিত সেই সমৃদ্ধ নগরী রাঢ়াপুরী, যা আজ কালের গর্ভে বিলীন। স্থানীয় ঐতিহাসিকদের মতে আড়ারা বা আড়া, বামুননাড়া,  গোপালপুর, রূপগঞ্জ, কালীগঞ্জ আর গড়ের জঙ্গলের একাংশ নিয়ে একসময় গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ নগরী " রাঢ়াপুরী "।





Wednesday, 29 June 2022

চাঁদ সওদাগরের শিবমন্দির

 

চম্পকনগরে চাঁদ সওদাগরের শিবমন্দির 


মনসামঙ্গল কাব্যের একটি কিংবদন্তী চরিত্র চাঁদ সওদাগর। চম্পকনগরের কথা মনে আছে তো ? হ্যা, মনসামঙ্গল কাব্যের চম্পকনগর। যেখানে রাজত্ব ছিল চাঁদ সওদাগরের। তিনি ছিলেন একজন ধনী ও ক্ষমতাশালী বণিক। অধুনা পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলাতে অবস্থিত চম্পাইনগরী বা কসবা-চম্পকনগরীই হল চাঁদ সওদাগরের  চম্পকনগরী। চাঁদ সওদাগর ও মনসা দেবীর দ্বন্ধের কাহিনী গড়ে উঠেছিল একালের কসবা-চম্পকনগরী ঘিরেই। মনসামঙ্গলে আছে .......... চম্পকনগরে বৈসে চাঁদ সওদাগর,‌‌             মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর।                           একনিষ্ঠ শিব ভক্ত চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে দেবী মনসার মন কষাকষির লড়াই হয়েছিল এইখানেই। চাঁদ সওদাগরের উপাখ্যানের সঙ্গেই সর্পদেবী মনসার পূজা প্রচারের কাহিনীটি জড়িত। আর আজও এখানে পূজো পাচ্ছেন চাঁদ সওদাগরের প্রতিষ্ঠিত শিব লিঙ্গ।

পাথরে খোদাই করা চাঁদ সওদাগরের মূর্তি


এই অঞ্চলের শিরায় শিরায় জড়িয়ে রয়েছে চাঁদ সাওদাগর, বেহুলা-লক্ষিন্দর এবং মা মনসার কাহিনী। এই  চম্পকনগরেই অবস্থিত মনসামঙ্গল খ্যাত এবং চাঁদ সওদাগর প্রতিষ্ঠিত বাবা রামেশ্বর শিব মন্দির এবং মা মনসার মন্দির।  চাঁদ সওদাগর এই মন্দিরে শিবের নিত্য পূজা করতেন এবং এই মন্দিরেই মিলন হত ভক্ত ও ভগবানের। 


দৃরে দেখা যায় বেহুলা-লক্ষিন্দরের মন্দির 

রামেশ্বর শিব মন্দিরের পিছনের দিক

 এই মন্দির ছাড়াও দেখতে পাবেন সান্তালি  পর্বত ,যেখানে বেহালা লক্ষিন্দরের লোহার     বাসর ঘর তৈরী হয়েছিল, যা এখন সতীতীর্থ নামে পরিচিত।  এখানে অনেকগুলি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়। কিছু মন্দির পুন:নির্মান করা হয়েছে যার মধ্যে মনসা মন্দির একটি। প্রাচীন শিবমন্দির এখন আর নেই।  এখন অনেকগুলি সিড়ি পেড়িয়ে উচু ঢাবির উপরে অবস্থিত মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মন্দিরে রয়েছে ছয় কোনা বিশিষ্ট ছয় ফুট উচ্চতা এক শিবলিঙ্গ।  মানুষ দু হাতে বেড় দিয়ে ধরতে সক্ষম নয়।  পুজো করার জন্য  সিঁড়ি দিয়ে  উঠে বসার ব্যবস্থা আছে।  শিব এখানে গৌরিপট্টহীন। রামেশ্বর শিবের পাশেই পুরোনো বট গাছের নীচেই রয়েছেন বানেশ্বর শিব।  কথিত আছে কালাপাহাড় বানেশ্বরের মাথায় আঘাত করার ফলে ফিনকি দিয়ে রক্ত পরতে শুরু করে, সেই রক্ত জমে সৃষ্টি হয় রক্তপুকুর। এখন অবশ্য পুকুরে  কাদা ছাড়া কিছু নেই। 

বানেশ্বর শিব 



এই সেই রক্তপুকুর ও দূরে রামেশ্বর শিব মন্দির 


দেবী মনসা তখনও মর্তলোকে পূজিত হন না এবং তাঁর পূজো প্রচলনের জন্য তিনি প্রথম তেজস্বী পুরুষ চাঁদ সওদাগরের কাছে যান। চাঁদ সওদাগর দেবী মনসাকে পূজো করতে অস্বীকার করেন।  দেবী মনসার রোষানলে পরেন চাঁদ সওদাগর।  একে একে তার সমস্ত পুত্ররা মারা যান। তার সপ্তডিঙ্গা ডুবে যায়। তবুও চাঁদ সওদাগর নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।  শেষমেশ সতী বেহুলার অনুরোধে দেবী মনসাকে তিনি বাম হস্তে পুষ্প প্রদান করেন এবং  সেইথেকে মর্তলোকে দেবী মনসার পূজার প্রচলন হয়।

মা মনসা দেবী


বিষদভাবে এই  ঘটনাই হিন্দু লোককথায় বর্ননা এইরকম:: 

হিন্দু লোককথা অনুযায়ী, চাঁদ সদাগর ছিলেন শিবের ভক্ত। মনসা চাঁদের পূজা কামনা করলে শিবভক্ত চাঁদ তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মনসা ছলনার আশ্রয় নিয়ে চাঁদের পূজা আদায় করার চেষ্টা করলে, চাঁদ শিবপ্রদত্ত ‘মহাজ্ঞান’ মন্ত্রবলে মনসার সব ছলনা ব্যর্থ করে দেন। তখন মনসা সুন্দরী নারীর ছদ্মবেশে চাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তার গুপ্তরহস্য জেনে নেন। এর ফলে চাঁদ মহাজ্ঞানের অলৌকিক রক্ষাকবচটি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু এরপরেও চাঁদ সদাগর তার বন্ধু ধন্বন্তরীর অলৌকিক ক্ষমতাবলে নিজেকে রক্ষা করতে থাকেন। ধন্বন্তরী চাঁদের থেকেও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন। তাই ছলনা করে মনসা তাকে হত্যা করেন। এরপর চাঁদ যথার্থই অসহায় হয়ে পড়েন।

এরপরেও চাঁদ মনসার পূজা করতে অস্বীকার করলে, মনসা সর্পাঘাতে চাঁদের ছয় পুত্রের প্রাণনাশ করেন। ভগ্নহৃদয় চাঁদ এতে বাণিজ্যে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু শত দুঃখকষ্টের মধ্যেও তিনি আবার বাণিজ্যে বের হন। সফল বাণিজ্যের পর তিনি যখন ধনসম্পদে জাহাজ পূর্ণ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করছেন, তখনই মনসা প্রচণ্ড ঝড় তুলে তার বাণিজ্যতরী শেরপুর শহরের অদূরে গরজরিপার অন্তর্গত কালিদাস সাগর ডুবিয়ে দেন। চাঁদের সঙ্গীরা মারা গেলেও চাঁদ প্রাণে বেঁচে যান। দুর্গা চাঁদকে রক্ষা করতে যান কালিদাস সাগরে। কিন্তু মনসার অনুরোধক্রমে শিব তাকে বারণ করেন। এরপর মনসা চাঁদকে ভাসিয়ে সমুদ্রের তীরে চন্দ্রকেতুর কাছে পৌঁছে দেন।


চন্দ্রকেতু চাঁদকে দিয়ে মনসার পূজা করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু চাঁদ তাতে সম্মত হন না। তাকে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করতে হয়। তা সত্ত্বেও তিনি শিবদুর্গার পূজা করে চলেন। মনসা তখন স্বর্গের দুই নর্তক-নর্তকীর সহায়তা নেন। তাদের একজন চাঁদ সদাগরের পুত্র রূপে এবং অপর জন চাঁদের বন্ধু সয়া বেনের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন।

চম্পক নগরে ফিরে এসে চাঁদ কোনোক্রমে নিজের জীবন পুনরায় সাজিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তার লখিন্দর নামে একটি পুত্র জন্মে। এদিকে সয়াবেনের স্ত্রী একটি কন্যার জন্ম দেয়, তার নাম রাখা হয় বেহুলা। দুজনে একসঙ্গে বেড়ে ওঠেন। তাদের অভিভাবকেরা দুজনের বিবাহের কথা চিন্তা করেন। কিন্তু কোষ্ঠী মিলিয়ে দেখা যায়, বিবাহরাত্রেই বাসরঘরে সর্পাঘাতে লখিন্দরের মৃত্যুর কথা লেখা আছে। কিন্তু মনসার ভক্ত বেহুলা ও লখিন্দর ছিলেন রাজযোটক। তাই শেষ পর্যন্ত উভয়ের বিবাহ স্থির হয়। লখিন্দরের প্রাণরক্ষা করতে চাঁদ একটি লৌহবাসর নির্মাণ করে দেন।

বেহুলার ভেলাযাত্রা, মনসামঙ্গল কাব্যের একটি পটচিত্র

এত সুরক্ষা সত্ত্বেও মনসা ঠিক পথ বের করে একটি সাপ পাঠিয়ে লখিন্দরের প্রাণনাশ করেন। সেযুগে প্রথা ছিল, সর্পদংশনে মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তিকে দাহ না করে কলার ভেলায় করে ভাসিয়ে দেওয়া হত। বেহুলা তার মৃত স্বামীর সঙ্গ নেন। সকলেই তাকে বারণ করেন। কিন্তু বেহুলা কারোর নিষেধ শোনেন না। ছয় মাস ধরে বেহুলা ভেলায় ভাসতে থাকেন। তিনি গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলেন। লখিন্দরের মৃতদেহে পচন ধরে। গ্রামবাসীরা তাকে উন্মাদ মনে করেন। বেহুলা মনসার কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন। কিন্তু মনসা শুধু ভেলাটিকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়া কিছুই করেন না।

প্রাচীন বটগাছে ঘেরা শিব মন্দির 


কলার ভেলা ভাসতে ভাসতে মনসার সহচরী নেতার ঘাটে এসে ভিড়ল। সেই ঘাটে কাপড় কাচত নেতা। বেহুলার প্রার্থনা শুনে নেতা ঠিক করেন যে তাকে নিয়ে যাবেন মনসার কাছে। নিজের অলৌকিক ক্ষমতাবলে তিনি বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে উপস্থিত করেন। মনসা বেহুলাকে বলেন, “যদি তোমার শ্বশুরকে দিয়ে আমার পূজা করাতে পারো, তবে তুমি তোমার স্বামীর প্রাণ ফিরে পাবে।” 



বেহুলা শুধু বলেন, “আমি করবই।” আর তাতেই তার মৃত স্বামীর দেহে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। তার পচাগলা দেহের অস্থিমাংস পূর্বাবস্থায় ফিরে আসেন। তিনি চোখ মেলে তাকান এবং বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসেন।

নেতা তাদের মর্ত্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। বেহুলা তার শাশুড়িকে সব ঘটনা বিবৃত করেন। তিনি চাঁদ সদাগরকে গিয়ে সব কথা জানান। চাঁদের পক্ষে আর না বলা সম্ভব হয় না।

প্রতিমাসের কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে চাঁদ সদাগর মনসার পূজা করতে সম্মত হন। কিন্তু মনসা তাকে যে কষ্ট দিয়েছিলেন, তা তিনি সম্পূর্ণ ক্ষমা করতে পারেন না। তিনি বাম হাতে প্রতিমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে মনসাকে পূজা করতে থাকেন। মনসা অবশ্য তাতেই সন্তুষ্ট হন। এর পর চাঁদ সদাগর ও তার পরিবার সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে। চাঁদ-এর ছয় পুত্রকেও মনসা জীবন দান করেন। চাঁদ সদাগরের মতো ধনী ও প্রভাবশালী বণিক মনসার পূজা করায় মনসার পূজা বৃহত্তর জনসমাজে প্রচার লাভ করে।

বর্তমান মনসা মন্দির 

মন্দিরে মনসা দেবী


চম্পাইনগর যেহেতু মনসামঙ্গলের সাথে জড়িত, তাই এখানকার অধিষ্ঠিত দেবী মা মনসা। গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার ছিলেন নায়েক বংশধারী। জমিদার বাড়ী সংলগ্ন এক মন্দিরে নায়কদের দ্বারা মনসাদেবী নিত্য পূজিত হন। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে পালিত হয় বিশেষ উৎসব ও মেলা বসে। সেখানে এই গ্রামের কামার, কুমার ও বেনে সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনও মাটি খুঁড়ে উনুন তৈরি করতে পারেন না, এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে। এই কাজ তাদের অন্য সম্প্রদায়কে দিয়ে করাতে হয়।

মন্দিরের প্রবেশমুখের সিড়ি






মন্দিরের সন্মুখভাগ



গৌরিপট্টহীন রামেশ্বর শিব লিঙ্গ 


প্রত্যহ এই মন্দিরে পূজো হয় এবং পূজা করবার জন্য  পূজারিও রয়েছেন।শ্রাবণ মাসে প্রত্যেক সোমবার ভক্তদের ভীর উপচে পরে। এছাড়া চৈত্র মাসের গর্জন ও শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে ১০ দিনের মেলা ও বাৎসরিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দূরদূরান্ত থেকে প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। তখন  শৈব উপাসক ও মনসা উপাসক মানুষের সহাবস্থান দেখা যায় এই অঞ্চলে। স্থানীয়দের দাবী ঠিক না ভুল সে প্রসঙ্গ ভিন্ন, তবে নির্জন শান্ত পরিবেশে আপনি হয়তো অনুভব করতে পারবেন বেহুলার দু:খের কথা অথবা লক্ষিন্দরের প্রতি প্রেমে অবদানের দিনলিপি।

গৌরিপট্টহীন রামেশ্বর শিব 


বেহুলা-লক্ষিন্দরের বাসরঘর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েও , নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে একবিংশ শতকে।  আজ চাঁদ সওদাগর নেই। নেই তার প্রতাপ।  তবে আজও বর্তমান চম্পকনগর। এই জায়গায় এলেই পৌঁচ্ছে যাবেন কয়েকযুগ আগে। মুখোমুখি দেখা হবে ইতিহাসের সঙ্গে। 

বর্ধমান জেলার পানাঘর থেকে প্রায় ২০ কিমি দক্ষিণে দামোদর  নদীর উত্তর তীরে রয়েছে এই স্থান। এছাড়া বুদবুদ থেকে কসবা হয়েও পৌচ্ছানো যায় চম্পকনগরে। বুদবুদ হয়ে দূরত্ব একটু বেশী হলেও এই রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত ভালো।




Saturday, 7 May 2022

ভ্রামরীদেবী --- জলপাইগুড়ি

 


ভ্রামরীদেবী দর্শন -- শক্তিপীঠ  ত্রিস্রোতা 


ভ্রমরী দেবী মন্দির পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের তিস্তা নদীর তীরে পুরানো শালবাড়িতে অবস্থিত।  মন্দিরটি নদীর তিন স্রোতের মধ্যে অবস্থান করছে বলে একে "ত্রিস্রোতা" বলা হয়। করোতোয়া, তিস্তা, জাঠোদা---- এই  তিন নদীর ধারার মধ্যে এই পীঠস্থান।পর্বতীরূপী দুর্গাদেবীর ভিন্ন ভিন্ন অবতার সমূহ হল ---- কালিকা, নন্দা,  ভ্রামরী, শাকম্ভরী,  রক্তদন্ডিকা, কৌশিক ইত্যাদি। এখানে দেবীর নাম ভ্রামরী। ভ্রামরী-র অর্থ হল মহিলা মৌমাছি রূপে মা দেবী দূর্গা।  ভৈরবের নাম ঈশ্বর বা জল্পেশ। ভৈরব জল্পেশ জল্পেশ মন্দিরে অবস্থান করছেন। একান্নপীঠের মধ্যে "ত্রিস্রোতা" হল এক শক্তিপীঠ। মন্দিরটি তৈরির সঠিক তারিখ এখনও অজানা । কারণ এটি এমন এক শক্তিপীঠ যা বহু শতাব্দী পূর্বে তৈরি হয়েছিল।

 বিভিন্ন  শাস্ত্র ও পুরাণ কাহিনীতে লেখা কাহিনীগুলি পড়লে আমরা জানতে পারি যে স্বর্গের আধিপত্য নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে বিবাদ  ও যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত।  "দেবী ভাগবত পুরাণ", "দেবী পুরাণ" প্রভৃতি গ্রণ্থে দেবী ভ্রামরী মাতার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।


 অরুণাসুর নামে এক অসুর দেবতাদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য অধিকার করার সংকল্প করে। তার বাসনা অনুযায়ী প্রভূ ব্রহ্মাকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করে। 




  সাধনার প্রথম দশ সহস্র বৎসরে সে প্রানায়াম ও শুধুমাত্র পত্রভক্ষন করে সাধনা করে। দ্বিতীয় দশ সহস্র বৎসরে শুধুমাত্র কয়েক বিন্দু জল ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেনা। তৃতীয় দশ সহস্র বৎসরে সে বায়ু ভক্ষন করে তপস্যা করে। চতুর্থ সহস্র বৎসরে উপবাস করে সাধনা করে। তখন তার সম্পূর্ণ দেহে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে।


  তপস্যাক্লিষ্ট অরুণাসুরের নিকট ব্রহ্মা উপস্থিত হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেন। অসুর অমরত্ব প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা রাজী হন না। তখন সে প্রার্থনা করে যে কোন দ্বিপদ বা চতুস্পদ জীবের হাতে তার মৃত্যু হবে না। ব্রহ্মা রাজী হয়ে তাকে সেই বর প্রদান করেন।


এরপর সে সমস্ত অসুরদের নিয়ে স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে। স্বর্গচ্যূত দেবগণ কৈলাস পর্বতে গিয়ে মহাদেবের নিকট পরিত্রানের উপায় প্রার্থনা করে। স্থির হয়, দেবী পার্বতী অরুণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এবং ষট্ পদ বিশিষ্ট ভ্রমরেরা তাঁর সৈন্য হিসাবে যাবে। সেই ভ্রমর, মৌমাছি, মশা কুলের আক্রমণে ও দেবীর অস্ত্র প্রহারে অরুণাসুর বধ সম্পূর্ণ হয়। এরপর দেবতারা পুনরায় স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করেন।



   অরুণাসুর বধের পর ভ্রমরগুলি পুনরায় দেবীর নিকট ফিরে আসে ও তাঁকে বেষ্টন করে রাখে। তিনিই দেবী মাতা ভ্রামরী কালিকা। সেই রূপেই তিনি পুজিতা হন।



জলপাইগুড়ি শহরের গোশালা মোড় থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে গেলেই চোখে পড়বে ডোমাকৃতির মন্দির। তিস্তানদীর পাশ ধরে এই মায়াবী মন্দির চেনে না বা নাম শোনেনি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্করই বটে। বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলের সারিবদ্ধ শাল ও সেগুন গাছ। চারিদিকে একটা মায়াবী এবং অলৌকিক পরিবেশের মাঝখানে বুক উঁচিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে মাতা ভ্রামরীর মন্দির।


 মন্দির নিয়ে  আরও অনেক গল্প আছে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এক লাল কাপড় পরা মহারাজ এসেছিলেন মন্দিরে । তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিশাল জটা ছিল। তিনি দীর্ঘদিন মন্দিরে পূজা ও যজ্ঞ করেন। তিনিই তিনটি মোটা গাছের গুড়ির নিচে মায়ের পাথররুপী বাম পার সন্ধান পান । এরপর দেশ বিদেশ থেকে মন্দিরে সাধুসন্তরা আসতে শুরু করে ।



 এই এলাকার এক প্রবীণ নিরেন রায় একটি দুর্ঘটনায় নির্দোষ হওয়া সত্বেও মামলায় জড়িয়ে যান। মা ভ্রামরী দেবীর কৃপায় তিনি সেই মামলা থেকে মুক্তি পান । তিনি মার নতুন প্রতিমা তৈরি করে পূজা করে ও জোড়া পাঠা বলি দেন।



সামনে রয়েছে পার্কিং স্পট। সেখান থেকেই শান বাঁধানো পথ চলে গিয়েছে মন্দিরের প্রবেশপথে। দরজার উপরে রয়েছে শিব-পার্বতীর বসে থাকার মূর্তি। মূল মন্দিরের প্রবেশমুখের বাঁদিকে রয়েছে সিদ্ধিদাতা গণেশ। গণেশের আরাধনা করেই মন্দিরে প্রবেশ করেন অনেকে। দেবীমূর্তি দেখে মন ছুঁয়ে যাবে। দেবী অষ্টভূজা, সালংকারা। দেবীর সামনে রাখা বড় বড় পাত্রে রাখা রয়েছে ভক্তদের নিবেদন। মন্দির প্রাঙ্গণেই রয়েছে বিশাল এক দালান। সেখানকার দেওয়ালে দেওয়ালে রয়েছে দেবদেবীর চিত্র। মূল মন্দিরের দরজা দিয়ে এগোলেই দেবীর সামনে রয়েছে ছোট একটি ব্যারিকেড। মহাদেবের মূর্তি রয়েছে দেবীর ডানপাশে, এবং তাঁর পাশে বসে রয়েছেন ষাড়রূপী নন্দী।



কক্ষের বাদিকে রয়েছে সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি নিয়ে যাবে সোজা ভ্রামরীদেবী মন্দিরের গর্ভগৃহে। সেখানেই রাখা রয়েছে সিংহবাহিনী কৃষ্ণবর্ণা দেবীর মূর্তি। পাশে রয়েছে সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম সতীর বাম পা। সেই পা রীতিমত রক্তবর্ণ লাল। মহিলাদের নিবেদনের সিঁদুর ও ফুল দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই গর্ভগৃহ। এই পা দেখতে ও পায়ে ফুল দিতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। মায়াবী এক টান কাজ করে মন্দিরে প্রবেশ করলেই।






মন্দিরের ভেতরে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা। এই মন্দির থেকে একটু বেরিয়ে প্রাঙ্গণের ভেতরে ডানেই রয়েছে জোড়াবট। গাছের নীচে রয়েছে লোকনাথ বাবার মূর্তি। খুব অদ্ভুতভাবে জোড়াবটটি নজর কাড়ে। বিশালাকৃতির দুটো গাছ আলাদা আলাদা থাকলেও উপরে উঠে একসঙ্গে মিলে যায়। সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে শাখা প্রশাখা। এবং এই শাখার ছায়ার তলেই বিশ্রাম নেন দর্শনার্থীরা। কালীপুজো তো বটেই, শরৎকালে হয় নবরাত্রির পুজো।



মন্দিরটি দিবারাত্রি সর্বদাই খোলা থাকে। এখানে মায়ের নিকট পূজা প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বে নিকটবর্তী তিস্তা নদীতে স্নান করে ধৌত বস্ত্র পরিধান করার রীতি প্রচলিত আছে।এই মন্দিরে পূণ্যার্থীগণের জন্য রাজ্য সরকার কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়াও ত্রিস্রোতায় ভ্রামরী দেবীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গে বৈষ্নব-শাক্ত-শৈব নানা পীঠের পর্যটন সার্কিট গড়েছে রাজ্য সরকার।




 মন্দিরে নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা সাড়ম্বরে পালিত হয়। মাঘী পূর্নিমার পূণ্য তিথিতে বিশেষ পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।



রেলপথে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এসে, সেখান থেকে অন্যান্য যানবাহনে মন্দিরে আসা যায়। এছাড়া জলপাইগুড়ি থেকে মায়ের মন্দির মাত্র ১৮ কি মি। তাই সড়ক পথে মে কোনো স্থান থেকে এখানে আসা যায়।







Friday, 7 January 2022

সোনামুখীর স্বর্নময়ী মা

 


সোনামুখীর স্বর্নময়ী মা


বাঁকুড়া জেলার প্রাচীন পৌর শহরগুলির মধ্যে অন্যতম শহর হ'ল সোনামুখী। এই শহরের মাঝখানে দেবী স্বর্ণমুখী বা সুবর্ণমুখী বা স্বর্নময়ী মা-এর মন্দির।  স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস এই দেবীর নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নাম  হয়েছে সোনামুখী।


ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে বহু যুগ আগে এই অঞ্চলে বর্গী আক্রমণ থেকে বাঁচতে শক্তিরুপে কালীপুজোর আরাধনা করা হত। বর্তমানে ইটের এক দালান মন্দিরে দেবী স্বর্নময়ী বা স্বর্নমুখী পূজিত হন। মন্দিরটি নতুন ভাবে তৈরী হয়েছে। মন্দিরে সিঁদুরলিপ্ত দেবীর পাষান মূর্তির অবস্থান।  মূর্তিটি ভাঙ্গা ও বিকৃত। একটি জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তিও মন্দিরে দেখা যায়। এই মূর্তিটিও দেবীর সাথে নিয়মিত পূজো পান। শোনা যায় কালাপাহাড় দেবীর নাক ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।  বর্গী অধিনায়ক ভাস্কর রাও ষোড়শোপাচারে তাঁর পূজো দিয়েছিলেন।  এছাড়া মন্দিরে বাঁকুড়ার মাটির দুটি ঘোড়া ও দুটি হাতির মূর্তি আছে।





আঞ্চলিক উপাখ্যানগুলি পড়লে জানা যায় যে বহুকাল আগে এলাকাটি জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।    এক গরু সেই জঙ্গলের মধ্যে একটি অশ্বথ গাছের তলার দুগ্ধ দিতো তাই বাড়িতে দুধ পাওয়া যেত না।একদিন তাঁরা খোঁজ করতে এসে খোঁজ পান ওই গাছের নীচে এক দেবী মূর্তির।ঘোটকারূঢ়া দেবীমূর্তি।পরে ওই জঙ্গল সাফ করে চালা করে মা'র পুজো হয়।এর বহু পরে মন্দির হয়।কালাপাহাড় যখন হিন্দু মন্দির ধ্বংস করতে করতে আসেন তখন তিনি এই বিগ্রহের ওপর আক্রোশে ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করেন।কিন্তু তাতে অক্ষম হয়ে রাগে মা'র নাকটি চেঁচে দেন।অর্থাৎ নাকভোঁতা করে দেন।এর বহুকাল পর এলাকাটি বর্ধিষ্ণু হলে জনৈক কেউ মা'র স্বর্ণমুখোশ করে দেন তাতেই নাম হয় স্বর্ণমুখী।কিন্তু কালক্রমে সেই সোনার মুখোশও আজ চুরি হয়ে গেছে।মা এখানে চতুর্ভূজা ঘটক পৃষ্ঠে আরূঢ়া অনেকটা যুদ্ধরত।মা'র চার হস্তে শঙ্খ চক্র বর ও অভয় (বর ও অভয় মুদ্রাটি ঠিক বোঝা যায় না)।মা চণ্ডীর ধ্যানে পূজিতা।মা'র দুই পাশে বুদ্ধদেব ও দুর্গা মূর্তি রয়েছে।




ঐতিহাসিকদের মতে সোনামুখী গ্রামের  জন্ম হয়েছিল সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে কোনও  এক সময়ে। জৈন ধর্মের প্রভাব,  মনোহর দাসের প্রসঙ্গ প্রভৃতি থেকে এই শহরের প্রচীনত্বের মাপ আন্দাজ করা যায়। পুথি থেকে জানা যায় যে সপ্তদশ শতাব্দীতে সোনামুখী এক তন্তুবায় প্রধান অঞ্চল ছিল।  ১৭৮৯ সালের এক রিপোর্টে জানা যায় সেই সময় এই এলাকায় তন্তুবায়দের বাসগৃহের সংখ্যা ছিল  প্রায় তিন হাজার  ও প্রায় চার হাজার তাঁতি তাঁত বুনতেন।


সোনামুখী থেকে সদর শহরের দূরত্ব ৪২ কি মি। আর বিষ্ণুপুরের দূরত্ব ৩৪ কি মি। এই দুটি শহরের সঙ্গে নিয়মিত বাস যোগাযোগ ছাড়াও দুর্গাপুর ও বর্ধমানের সঙ্গে বাস যোগাযোগ রয়েছে। সোনামুখীর চারপাশের প্রকৃতি এককথায় সুন্দর। নদীর ধার, জঙ্গল, মন্দির, উৎসব,মেলা, বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে সোনমুখীতে দু একটা দিন কাটাতে আশাকরি ভালই  লাগবে।