Thursday, 8 August 2019

উজানী -- হিন্দুদের এক পীঠস্থান

উজানী -- হিন্দুদের এক পীঠস্থান

পুরান মতে, অজয় নদের তীরবর্তী উজানি বা কোগ্রাম হিন্দুদের একটি পীঠস্থান। শাস্ত্রমতে এখানে দেবী ভগবতীর কনুই পরেছিল। হিন্দুদের এই পীঠস্থানে দেবী মঙ্গলচণ্ডী এবং ভৈরব কপিলেশরের প্রস্তর মূর্তির দেখা পাওয়া যায়। দেবী মা চন্ডী এখানে মা কালী হিসাবে পূজা পান। বহুকাল থেকে শাস্ত্রীয় নিয়মে, প্রথা মেনে এখানে কালীপুজো করা হয়। মাছের ভোগে মা কালীর আরাধনা করা হয় উজানীর সতীপীঠে।

মন্দিরের গভ'গৃহে কাঠের সিংহাসনের ওপর আছেন দশভূজা মহিষমরদিনী চন্ডীকা দেবী। বাম দিকে আছেন গৌরীপট্টহীন শিবলিঙগ কপিলেশর, পাথরের বৃষমূতি' এবং ধ‍্য।নী বুদ্ধমূতি'।
দেবীর মূল পূজা হয় শারদীয় দুর্গাপূজোর  সময়।পূজো চলে ষষ্টি থেকে দশমী পর্যন্ত। এটি সতীপীঠ হওয়ার জন্য পূজোয় আলাদা করে মূর্তি আসে না এবং নবপতৃকা আনা হয় না। শুধু ঘট, বারি আনা হয়। বছরে তিন বার ঘট বদল হয়। প্রথম ঘট আসে বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার এবং বাৎসরিক পূজা হয়। এরপর ঘট আসে জিতাষটমীর পরদিন, যাকে বোধনের ঘট বলা হয়। তারপর ঘট আসে দূর্গাপূজোর ষষ্ঠির দিন। এছাড়াও বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাসের মঙ্গলবারে মঙ্গলচণ্ডীর পূজো হয়। এখানে বলিপ্রথা চালু আছে। দূর্গা পূজার সপ্তমী ও অষ্টমী তিথিতে চালকুমড়ো, নবমীতে চালকুমড়ো, কলা, আখ এবং ছাগ বলি হয়।

প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ১টা এবং ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।


উজানী সতীপীঠ ,  কোগ্রামে লোচনদাসের পাট এবং কুমুদরনজের বাসস্থানের পশ্চিম দিকে , একেবারে অজয় নদের তীরে অবস্থিত। এটি মঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত লাখূরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতর অধীন। নতুনহাট পীরতলা থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে অথবা গুসকরা থেকে ১৮ কি মি পূর্বে কুনুর নদীর আগে উত্তর দিকে নেমে যাওয়া রাস্তা দিয়ে খানিকটা গেলেই উজানী বা কোগ্রাম পৌছানো যায়। উজানীর পাশেই অজয়-কুনুরের সঙ্গম স্থল।

















Wednesday, 17 July 2019

মা শীতলা দেবী, গ্রাম - সুগন্ধা, হুগলি।

মা শীতলা দেবী, সুগন্ধা গ্রাম, হুগলী।


হুগলি জেলার সুগন্ধা গ্রামে প্রচুর গাছ গাছালিতে ঘেরা আমবাগানের অন্ধকার ছায়ায় মা শীতলা দেবী অধিষ্ঠান করছেন। প্রাচীন এই শীতলা মা প্রায় চারশো বছরেরও বেশী দিন ধরে অন্ধকারে ছিলেন।

শোনা যায় বছর দশেক আগে গ্রামের কাউকে মা স্বপ্নে দেখা দিয়ে জানান দেন, যে তিনি ওখানে চারশত বছর ধরে আছেন। স্বপনাদিষ্ট ব্যক্তিটি পরের দিন সকালে গ্রামের কয়েকজনকে সে কথা বলেন। সেই থেকে গ্রামের লোকের তৎপরতায় চারপাশ পরিষ্কার করতে করতে মায়ের দেখা পান। কিন্তু মা যেখানে আছেন তার কাছাকাছি বেশ কিছুটা জায়গা পর্যন্ত, গাছ তো দূরের কথা, কোনোভাবেই কেউ লতাও ছিঁড়তে পারলেন না। যতবারই গাছ কাটতে চায়, ততবারই ঘটে যায় কোনো না কোনো দূর্ঘটনা। মায়ের মনোভাব বুঝতে ও জানতে পেরে , শেষে সকলে সিন্ধান্ত নেয় যে, মূল বেদীটি যেমন রাখা আছে তেমনই রাখা হবে। যে গাছে হাত দিলে মা অসুন্তষ্ট হন, তা বাদ দিয়ে পরিষ্কার করা হবে। এরপর থেকেই শুরু হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মানুষের সহায়তায় মাকে জনসমক্ষে আনার চেষ্টা।

এই ভাবে মাকে লোকচক্ষুর অন্তরাল থেকে জনসমক্ষে আনা হয়। এত সুন্দর নির্জন ছায়ায় একটি প্রসিদ্ধ স্থান আছে , আট দশ বছর আগেও এলাকার লোক সেভাবে জানতো না। শোনা যায় আগে গ্রামের কারো মায়ের দয়া হলে, জঙ্গল হাতরে ঝোপ সরিয়ে মায়ের থানের মাটি বা থান ধোয়া জল এনে রোগীকে দেওয়া হত। তারপর রুগী সুস্থ হলে মাকে সামান্য পূজো দিয়ে আসতো।

চুঁচুড়া ষ্টেশন থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মায়ের এই স্থানে দিনের বেলাতেও লোক যেত না। যেতে হলে ভয়ে ভয়ে সকলে একসাথে যেত। যেখানে দিনের বেলায় লোক যেতে ভয় পেত, সেখানে এখন পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ এর আলো , সব কিছুরই সুন্দর ব্যবস্থা হয়েছে। তবে মূল বেদীটি ও মূল্ জায়গাটি যেমন ছিল তেমনই আকারে সংরক্ষিত আছে। পাশেই রয়েছে ছোট্ট একটা পুকুর। সেখানকার জল দিয়ে মায়ের সব কাজকর্ম হয়। জনৈক ব্যবসায়ী পুকুরটিকে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন।

প্রতিদিন তিন বার করে পূজা হয়। সকালে, দুপুরে ও সন্ধ্যায়। আর প্রতি আমাবস্যায় মায়ের বিশেষ পূজা হয়। ঐ দিন রাত্রে ভোগ খাওনোর ব্যবস্থা আছে। আবার মহা ধুমধাম করে প্রতি বৎসর ১৮ই চৈত্র মায়ের বাৎসরিক উৎসব বা পূজা হয়। আগে এখানে বলি প্রথা ছিল। এখন সেটা উঠে গেছে। বলি আর  হয় না। প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার লোক সেদিন ওখানে মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করে। সকাল থেকে রাত অব্দি ভোগ রান্না ও বিতরণ চলতে থাকে। ভোগ বলতে থাকে খিচুড়ি, একটা সবজি, চাটনি ও পায়েস। যে যতটা পারেন খেতে পারেন। আর বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে নিয়েও যেতে পারেন। তার জন্য কোনো কিছু দিতে হয় না। আশেপাশের দশ বিশটা গ্রামের কারো বাড়ীতে সেদিন রান্নার হাঁড়ি চরে না।এই বিশাল আয়োজনের আয়োজক হন এলাকার সাধারণ মানুষ আর আঞ্চলিক ব্যবসায়ীরা। নিজের নিজের ইচ্ছা মত সকলে এই কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করে। এখানে কোনো চাঁদার জুলুম নেই। যার যা সামর্থ্য মন্দিরে দিয়ে যান। এখানে কোনো রকম কোনো কিছু বাধ্যতামূলক নেই।

হাওড়া থেকে মেনলাইনের পান্ডুয়া, মেমারি, ব্যান্ডেল বা বর্ধমান লোকাল ধরে চুঁচুড়া ষ্টেশনে নামতে হবে। আপের দিকে মুখ করে সাবওয়ে দিয়ে নেমে বাম দিকে অটো, টোটো অথবা ১৭ / ১৮ নম্বর বাসে সুগন্ধা মোড়। আর গাড়িতে গেলে দিল্লি রোড ধরে সুগন্ধা মোড় পর্যন্ত যেতে হবে। আর যদি চুঁচুড়ার কাছাকাছি থাকেন তবে সাইকেল বা বাইকে যেতে পারেন। সুগন্ধা মোড় থেকে পাঁচ সাত মিনিট সোজা দোলতলার যাওয়ার রাস্তায় গেলেই পরবে একটা তিন মাথার মোড়। বামদিকে দোলতলা রেখে ডানদিকের রাস্তা ধরে গেলেই পরবে মা শীতলার মন্দির।



















Thursday, 4 July 2019

শ্রী শ্রী জোহরা চন্ডী দেবী, মালদা।

শ্রী শ্রী জোহরা চন্ডী দেবীর মন্দির, মালদা।

স্থানীয়রা একে জহরাতলা কালী মন্দির বলে থাকে। মালদা শহরের বাহিরে এক প্রান্তে এই মন্দির অবস্থিত। এক ধারে সবুজ মাঠ আর অন্য দিকে আমবাগানের মধ্যে অবস্থিত। বাংলাদেশ বর্ডার এর খুব কাছে।
কথিত আছে মূল মন্দির রাজা বল্লাল সেন তৈরি করেছিলেন, যিনি কিনা সেন রাজত্বের তৃতীয় রাজা ছিলেন। মালদার আদিশকতির মন্দির হিসেবে বিশেষ পরিচিত। এখানে দেবীর শুধু তিনটি মুখমণ্ডল দেখা যায়। দেহের অন্য অঙ্গ দেখা যায় না। এই মুখগুলি মা কালী, মহা লক্ষ্মী ও মহা সরস্বতীর বলে কল্পনা করা হয়। বৈশাখ মাসে রোজদিন এই মন্দির খোলা থাকে, কিন্তু অন‍্য মাসে সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার খোলা হয় বেলা ১০ টার সময়। সপ্তাহের অন‍্যদিন বন্ধ থাকে। এখানকার সেবইত শ্রী তেওয়ারিদের অষ্টম পুরুষ এখন পূজার কাজ সম্পন্ন করে থাকে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল ভক্ত সমাগম হয় বলে পূজা দিতে হলে হাতে অনেক সময় নিয়ে আসতে হয়।

















ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া

Friday, 14 June 2019

টেরাকোটার গ্রাম বনকাটি, পশ্চিম বর্ধমান।

টেরাকোটার গ্রাম বনকাটি, পশ্চিম বর্ধমান।

বন কেটে বসত, তাই নাম বনকাটি। তবে বন কেটে বসত স্থাপনের সময়কালের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। একদল মানুষ বন-জঙ্গল সাফ করে বসত এবং আবাদের জায়গা বার করতে। তাদের " বন কাটাদের দল " বলা হতো। তাদের বসবাস থেকেই বনকাটির নাম। অবিভক্ত বর্ধমান জেলার আউশ গ্রাম এবং কাঁকসা থানার উত্তর প্রান্তিয় অজয় নদীর তীরবর্তী এই জঙ্গলভূমির নামেই অযোধ্যা-বনকাটি। অবস্থান পরিচিতি সুবিধার জন্য এই নামকরণ।

তখনকার দিনে কাঁকসা থানা এলাকার সমগ্র ভূখণ্ডই সেনপাহাড়ি নামে পরিচিত। বাংলার বিখ্যাত সেন রাজাদের নামেই সেনপাহাড়ি। লক্ষন সেন তন্ত্র সাধনার জন্য এখানে এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন তাঁদের গুরুদেব মহেশ্বর প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে। ইনি একজন তান্ত্রিক ছিলেন। প্রচুর জমিজায়গা লাভ করে মহেশ্বর প্রসাদ এখানেই বসবাস স্থাপন করেন। বর্তমান বনকাটির রায়বাড়ি ইনারই বঙশধর। এলাকার অন্যতম প্রাচীন এই পরিবারের কালীপুজো খুবই বিখ্যাত। আবার উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা থেকে আসা সংস্কৃত পন্ডিত ব্রাহ্মণের বসবাসের কারনে গ্রামের সেই অংশের নাম পরবর্তী কালে "অযোধ্যা" হয়।

গ্রামের প্রথমেই রয়েছে কালীতলা। নাম থেকেই বোঝা যায় এখানে একটি কালী মন্দির আছে। এই মন্দিরে গ্রামের সবলোক পূজো দেয়। একদিকে তিনটি রেখদেউল এবং এর উল্টো দিকে দুটি প্রাচীন আটচলার মন্দির। রেখদেউল গুলির প্রথম মন্দিরটির নাম গোপালেশ্বর, পরেরটির নাম উমেশ্বর আর তৃতীয় দেউলটির নাম কালীশ্বর। আটচলার মধ্যে বাঁ দিকে প্রথম মন্দিরটির নাম বিশ্বেশ্বর। দরজার খিলানের‌‌‌ উপর চমৎকার দূর্গা প্যানেল। ডানদিকের মন্দিরটির নাম উমেশেশ্বর। খিলানের উপর চমৎকার গনেশ মূর্তি শোভা পাচ্ছে। এই মন্দির গুলি যাঁরা তৈরি করেছিলেন সেই বঙশের বর্তমান উত্তর পুরুষ অনিল কুমার রায়। এখন ওঁরা রায় পদবী ব্যবহার করেন। এক বিশাল কাঁসার রেকাবির পিছনে ওদের বঙশতালিকা লেখা আছে। এই রেকাবিটা যা এখনও রয়েছে, বাকি সমস্ত বাসন কোসন ডাকাতরা নিয়ে গেছে। গুপ্ত ধনের সন্ধ্যানে মাঝে মধ্যে ডাকাতরা এখনও খোঁড়াখুঁড়ি করে। আরও দুটি দেউল আছে, মাথা অব্দি আগাছায় ঢাকা। প্রচুর সাপ আছে ঐ জঙ্গলে এবং ভাঙ্গা দেউলে। তাই সেখানে যাওয়া মানা।

আর আছে এই গ্রামের প্রাক্তন জমিদার এবং ইংরেজ আমলে গালার ব্যবসা করে ধনী‌ হয়ে ওঠা, রামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত পঙ্চ রত্ন মন্দির। মন্দিরের মধ্যে আছে এক বৃহৎ শিবলিঙ্গ। মন্দিরের টেরাকোটার কাজ সত্যিই দেখবার মত। চর্মচোখে অবিশ্বাস্য। পঙ্চ রত্ন মন্দিরের পাশেই একটি টিনের চালার নীচে রাখা আছে পিতলের তৈরি এক বিস্ময়কর রথ। আকারে এত বড় আর এমন শৈল্পিক ও দৃষ্টি নন্দন রথ সচারচর দেখা যায় না। ঠাকুরও আছে পিতলের তৈরি, আছে সোনা রূপার গহনা, মুকুট ইত্যাদি। একটি রথযাত্রা কমিটি রথের দিনের সমস্ত কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করে। এখনও পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গে ৪১টি পিতলের রথের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এরমধ্যে বনকাটির রথই প্রাচীনতম।

সেই কোন যুগে নন্দলাল বসু শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ছাত্র ছাত্রীদের বনকাটিতে পাঠিয়েছিলেন এই রথের চিত্র দেখে আসতে। এঁরা মুক্তকন্ঠে এই রথের অসাধারণ চিত্রগুলির কথা বলেছেন। কলাভবনের কালো বাড়ীর ফ্রেসকোর অনুপ্রেরণা বনকাটির পিতলের রথের গায়ে খোদাই করা এই ছবি। প্রায় সত্তর বছর আগে এসেছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পী এবং কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ শ্রী মূকুল দে এই বনকাটি গ্রামে। এখানকার পোড়া মাটির কাজ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাঙালি পর্যটক এসব স্থানে আসে না। এই সব টেরাকোটা কাজ সমৃদ্ধ মন্দির আমাদের অজ্ঞতা আর অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। তাই উপেক্ষিত বনকাটি লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। বাঙালিরা নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে কতটা উদাসীন, এটাই তার প্রমাণ।

কলকাতা থেকে যেতে হলে NH2 ধরে এসে, দার্জিলিং মোড় পার হয়ে পানাগড়-মোড়গারম হাইওয়ে ধরে নামতে হবে ইলামবাজারের কিছু আগে এগারো মাইল স্টপেজে। আর শান্তিনিকেতন থেকে এলে ইলামবাজার পার করে এগারো মাইলে নামতে হবে। মোড় থেকে রিকশা বা ভ্যানে করে যাওয়া যায় খুব কাছের অযোধ্যা-বনকাটি গ্রামে।


 J