Sunday, 20 June 2021

তপোবনে বাল্মীকির আশ্রম

 


বাল্মীকির  আশ্রম  ---- তপোবন 





যে বনে মুনিঋষিরা তপস্যার জন্য বাস করতেন,  সে বনই হলো তপোবন ।  তপোবন কোনোও নির্দিষ্ট জায়গার নাম নয়। তপস্যাসাধনের বনই হ'ল তপোবন।  পুন্যভূমি ভারতবর্ষে কতই না আছে তপোবন।  ভারতবর্ষ মুনিঋষিদের দেশ। যেখানেই সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিদের আশ্রম স্থাপিত হয়েছে বা পুন্যাত্মা মুনিঋষিদের বানী বর্ণিত হয়েছে, সেটিই তপোবন বলে নামকরন হয়েছে। এখানে যে তপোবনের কথা বলতে চলেছি _____ এ তপোবন রত্নাকর দস্যুর তপোবন।  ভয় পাবার কিছু নেই।  কেননা আজ কোনো দস্যুও নেই,  আর সেজন্য লুটপাট হবারও কোনো ভয় নেই। তবে বনের মধ্যে , আপনার ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন থাকে , তবে  হাতির পালের দেখা মিলতেও পারে। এ দেখে আপনি মজা পাবেন না ভয় পাবেন সেটি আপনার নিজস্ব ব্যাপার।  





ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিমি দূরে দেউলবাড় গ্রামে গেলে দেখতে পাবেন রামেশ্বর শিব মন্দির।  সেই শিবমন্দির থেকে ৭ কিমি দক্ষিনে সুবর্ণরেখা নদীর ধারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে অপরূপ সুন্দর এক জায়গা ----- বাল্মীকির তপোবন। হাত বাড়ালেই সুবর্ণরেখা নদী। আর জঙ্গলের রূপকে তো এককথায় অপরূপ বলা যায়। খড়্গপুর,  মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম বা বেলদা থেকে কালো পিচের রাস্তা আর সবুজ শাল গাছের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিংবা সবুজ জঙ্গল আর রঙ্গিন মোরামের রাস্তা ধরে চলতে চলতে আপনি কখন যে পৌচ্ছে যাবেন নিজেও বুঝতে পারবেন না। সড়কপথে চড়াই উতড়াই হলেও  এ পথের শোভা আর তাজা অক্সিজেন পাওয়ার আনন্দ,  আমার মনে হয়, আপনার চিরকাল মনে থাকবে।



বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।  আর বিশ্বাসই ভারতীয় সভ্যতার প্রানভোমরা। এই বিশ্বাসেই ভারতবর্ষের সর্বত্র রামায়ণ মহাভারতের অধিষ্ঠান। রামচন্দ্র,  সীতা ও লক্ষনের সাথে বনবাসে যাওয়ার  পথে বাল্মীকির তপোবনে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন।  এখান থেকে পঞ্চবটী বনে গিয়ে  কুটির  তৈরি করে থাকলেন।  রাবণ সেখান থেকে সীতাকে চুরি করে। সীতাকে রাবনের হাত থেকে উদ্ধার করে চৌদ্দ বছর পরে রাজ্যে ফিরে এসে রামচন্দ্র যখন রাজা হয়েছিলেন,  তখন প্রজারা গর্ভবতী সীতার চরিত্রে সন্দেহ প্রকাশ করেন। রামচন্দ্র প্রজাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সীতাকে পরিত্যাগ করেন।  লক্ষণ সীতাকে পুনরায় অরন্যে বাল্মীকির তপোবনে রেখে আসেন।  কিছুকাল পরে সীতার দুই জমজ সন্তান  লব ও কুশ জন্মগ্রহণ করেন। তারা বাল্মীকি মুনির কাছে সর্ব শাস্ত্র অধ্যয়ন করে এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হন। এই সময় রামচন্দ্রের অশ্বমেধের ঘোড়া যখন এই স্থান দিয়ে যায়, তখন লব-কুশ সেই অশ্বকে ধরে রাখে  । ফলে রামচন্দ্র ও তাঁর তিন ভাইয়ের সাথে তাদের প্রবল যুদ্ধ হয়। লব-কুশের কাছে তারা সকলেই পরাজিত হয়ে চেতনা হারান।  খবর পেয়ে সীতা ছুটে আসেন  এবং এসব দেখে কান্নাকাটি আরম্ভ করেন। সীতার কান্না শুনে বাল্মীকি মুনি আসেন ও  মন্ত্রপুত জল ছিটিয়ে তাদের চেতনা ফেরান । লব-কুশকে অশ্বমেধের ঘোড়া ছেড়ে দিতে বলেন।  বাল্মীকির কথায় লব-কুশ ঘোড়া ছেড়ে দেন।



সীতানালা নামে একটা ছোট অরন্য ঝর্ণা তিন দিক থেকে তপোবনকে ইউ-এর মতো ঘিরে রয়েছে। আর একদিকে সুবর্ণরেখা নদী। কথিত আছে, বনবাসে থাকার সময়ে সীতা এই নদীতে স্নান করতেন বলে এই নদীর নাম সীতানালা। তপোবনে ঢোকার জন্য খালের উপরে এখন কংক্রিটের সেতু হয়েছে। আগে কাঠের সেতু ছিল।  সেতু পেরিয়ে একটু এগোলেই মহর্ষি বাল্মীকির সমাধি। সমাধির নিচ থেকে মাকড়া পাথর সাজিয়ে উড়িষ্যার রেখ দেউল রীতিতে একটি ছোট মন্দির চূড়া তৈরি করা হয়েছে। সমাধির উপরে একটি লম্বা-লম্বি চেরা শালগাছ রামধনুর মত দুপাশে মটি স্পর্শ করে আছে। এই শালগাছটির নাম হল সীতা দাঁতন।  সীতা নাকি শাল দাঁতনে দাত মাজার পরে দাঁতন চিরে জিভ ছুলে ফেলে দিলে এই গাছের জন্ম হয় বলে এর নাম সীতা দাঁতন।  সমাধির পাশেই একটা বেদির উপরে একটা হোমকুণ্ড আছে যার আগুন রাতদিন জ্বলতে থাকে। কেউ বলেন  বাল্মীকির হোমকুণ্ড। আবার কেউ একে সীতাধুনি বলে সম্বোধন করেন। সীতার গর্ভে লব-কুশ জন্মানোর পর আঁতুড়ের পাশে সীতাদেবী শিশুদের উষ্ণতা প্রদানের জন্য এই ধুনি জ্বেলেছিলেন, তাই এটা সীতাধুনি নামে পরিচিত। নিয়ম হচ্ছে, এখানে যেই আসুক না কেন বন থেকে এক খন্ড কাঠ এনে এই ধুনিতে দিয়ে যেতে হয়।



উত্তরে সীতানালা আর দক্ষিণে সীতাকুন্ড থেকে নির্গত হলুদ জলের ঝর্ণা তপোবনকে বেস্টন করে একসঙ্গে মিলিত হয়ে চলে গেছে সুবর্ণরেখার দিকে। জনশ্রুতি, সীতা এখানে তেল হলুদ মাখিয়ে লব কুশকে নিয়মিত স্নান করাতেন বলে জলের রং হলদে হয়ে গিয়েছে। বাল্মীকির সমাধির পাশেই রয়েছে একটা ছোট্ট মন্দির  যেখানে বাল্মীকি, রাম, লক্ষণ, সীতা, লব ও কুশের মূর্তি রয়েছে। একে সকলে বাল্মীকি মন্দির বলে। যেখানে লব-কুশ অশ্বমেধের ঘোড়া ধরেছিল তা এই আশ্রম থেকে প্রায় ৫ কিমি দুরে গভীর অরন্যের মধ্যে অবস্থিত। অরন্যের প্রবেশ পথের বাম দিকে একটি স্থানে একটা সিমেন্টের ঘোড়া তৈরি করে রাখা আছে। মনে হবে যেন এখানেই বাঁধা ছিল সেই অশ্বমেধের ঘোড়া। আশ্রমের একটু দূরেই  সীতানালা পাশেই রয়েছে তিলক মাটির পাহাড়। সেখানে থেকে আপনি নিজের ইচ্ছামতন তিলক মাটি সংগ্রহ করতে পারেন। বাল্মীকি মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি মহাদেব মন্দির। আবার একটি বীর হনুমানের মন্দিরেরও নির্মাণের কাজ চলছে।



বাল্মীকি মন্দিরে রোজদিন অন্নভোগ হয়। যে কেউ মানসিক করে এখানে অন্নভোগ নিবেদন করতে পারেন।  প্রতি পূর্ণিমায় এবং অষ্টমীতে মন্দিরে নাম সংকীর্তন হয়। মন্দির খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। 







শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়েই মানুষ পৃথিবীতে তীর্থ রচনা করে। রামায়ণ বর্ণিত বাল্মীকির তপোবনের সঙ্গে এই তপোবনের কোনো সম্পর্ক আছে কি নেই  , তপোবন দর্শনের জন্য সেই বিতর্কে না যাওয়াই  ভালো। কিন্ত এই স্থানের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যথার্থভাবেই প্রাচীন তপোবনের উপযুক্ত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। 





Wednesday, 7 April 2021

গাঁয়ের নাম খোয়াব গাঁ ---- ঝাড়গ্রাম

 



জঙ্গলমহলের এক রূপকথা ______ গাঁয়ের নাম খোয়াব গাঁ_______ ঝাড়গ্রাম।



ঝাড়গ্রামে কাজুবাদাম আর আকাশমনির জঙ্গলের ভিতরে স্বপ্নের গ্রাম খোয়াব গাঁ। অবশ্য এই গ্রামের নাম আগে খোয়াব গাঁ ছিল না। "লালবাজার" নামেই শহরের অদূরে এই গ্রাম পরিচিত ছিল। ঝাড়গ্রাম রেল স্টেশন থেকে পুলিশ লাইনের মেন রোড ছেড়ে কেনেল পাড়ের রাস্তা দিয়ে সোজা কাজুবাদাম আর আকাশমনির গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মোরামের উঁচুনিচু রাস্তা ধরে প্রায় চার পাঁচ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে পথের শেষে পাওয়া যাবে এই গ্রাম। তবে এই লালবাজার কথার মধ্যে যেন পুলিশ পুলিশ একটা গন্ধ রয়েছে। তাই গ্রামবাসীর সন্মতিতে ২০১৮ সালের শেষে নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা হলেন চালচিত্র অ্যাকাডেমির সম্পাদক শিল্পী শ্রী মৃণাল মন্ডল‌। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক শ্রী শিবাজী বন্দোপাধ্যায় " খোয়াব গাঁ" নামটি ঠিক করে দেন। গ্রামে শিল্পচর্চার মাধ্যমে যে স্বপ্ন বা খোয়াব বোনা হচ্ছে ---- এই নাম তারই সার্থক প্রতিফলন। 




ঝাড়গ্রাম ব্লকের রাধানগর পঞ্চায়েতের অধীন এই গ্রামে মোট ১৩ টি পরিবারের বাস। এর মধ্যে ১২টি পরিবারই লোধ সম্প্রদায়ের। রয়েছে একটি কুর্মি পরিবার। গ্রামের জনসংখ্যা মাত্র ৭৫ জন। এই ছোট্ট গ্রামের বসতি গড়ে উঠার কাহিনীটি এই রকম -------- ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজাদের চাষের জমি ছিল স্থানীয় অর্জুনডহড়, রাজবাধ আর মধুপুর মৌজায়। পঞ্চাশ দশকের কিশোর কালীপদ অহির , অধুনা প্রবীন বাসিন্দা, বাবার সাথে এসেছিলেন রাজাদের জমিতে খেতমজুরি করতে। পরে রাজপরিবারের তরফে তাঁকে থাকার ঘর দেওয়া হয়। সেদিনের কালীপদ লালবাজারের সংসার পাতেন। খেতমজুরের কাজে আসা লোধেরা রাজানুগ্রহে এলাকায় থিতু হয়ে যান। 




খেটে খাওয়া লোধ জনজাতির বাসিন্দারা কিছু দিন আগে পর্য্যন্ত  সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। জঙ্গলের ডালপালা কেটে তা সংগ্রহ করে বিক্রি, নয়তো খেতমজুর কিংবা দিনমজুরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, বা মরশুমে ভিন্ জেলায় 'নামাল' খাটতে যাওয়া। তাঁদের এই দিন-আনির সংসারে লড়াইটা ছিল খিদের সাথে। এমনিই একটা গ্রাম খুঁজছিলেন মৃণালবাবু। ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ মৃণালবাবু খুঁজে পেলেন এই লালবাজার যেখানে পরীক্ষা মূলক ভাবে শিল্পচর্চার মাধ্যমে জনজাতির মানুষজনের জীবনে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনা যায়। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা এই গ্রামেই গড়ে তুললেন " ওপেন ষ্টুডিয়ো "। প্রথমে ট্রান্সপারেন্ট শিটের উপরে আঁকা ছবির উপরে টর্চের আলো ফেলে চলচ্চিত্রের মতো ছবি দেখানো হল। হাতে কলমে দেখানো হল কি ভাবে কাজটা করা হয়েছে। তাতে বেজায় মজা পেলেন গ্রমবাসীরা। তাদেরকে ফুল, পাতা, কাঁচা হলুদ, বেলের আঠার মতো প্রাকৃতিক ও ভেষজ উপাদান দিয়ে প্রকৃতিক রং তৈরি শেখানো হলো। শুকনো ছাল-বাকল-শিকড়ের মধ্যে শিল্প আবিষ্কারের " চোখ " তৈরির কাজ গ্রামবাসীরা শিখলো। সাথে সাথে মৃণালবাবু চেষ্টা চালিয়ে গেলেন নতুন প্রজন্মের কাছে পড়াশুনার গুরুত্ব বোঝাতে। এরই ফল হিসাবে গ্রামবাসীরা শপথ নিতে শিখেছে " শিখব, পড়ব, জানব, স্কুলছুট হব না "। বেশিরভাগ পরিবারের নারী পুরুষ জঙ্গলের কাঠ কেটে মাথায় বয়ে নিয়ে গিয়ে মহাজনদের কাছে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু জঙ্গল ফুরিয়ে গেলে কি কি সমস্যা হতে পারে সেগুলো তাদেরকে বোঝানো হল। আর এর কিছুদিন পরেই এর সুফল পাওয়া গেল। বাসিন্দাদের রোজকার জীবনেও এখন পরিবর্তন এসেছে। গ্রাম পরিচ্ছন্ন রাখেন বাসিন্দারা। গ্রামের খুদেরা সময় পেলেই দেওয়ালে-দরজায় ছবি এঁকে ভরিয়ে দেয়। বাঁশ কাঠের তৈরি ময়ূর, গনেশের মুখ, কাকড়া বিছে_____ এগুলোর নাম কাটুম কুটুম। শিশুরাই এগুলো বানায়। পর্যটকেরা গ্রামে এসে কিনে নিয়ে যান লোধ শিল্পদের তৈরি কাটুম কুটুম, মাটির পুতুল, ছবি ইত্যাদি। এক সময় জঙ্গলজীবি মানুষজন রুজির টানে বনজ সম্পদ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এখন তারাই জঙ্গল রখ্খা করেন। তাদের এখনকার প্রতিঞ্জা --- " আমরা সারা জীবন যত গাছ কেটেছি, তার থেকেও অনেক বেশি গাছ লাগানোর প্রতিঞ্জা করছি " ।




এরই মাঝে কথায় কথায় এক প্রবীনের মুখে আখ্যেপের সুর বেজে উঠলো। তিনি জানালেন   " আমাদেরও যে সন্মান থাকতে পারে, সেটা আগে কখনোও ভাবিনি। ছোটবেলায় শুনেছি বাপ-ঠাকুরদাকে প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দিতে হতো। আমরা নাকি অপরাধী জাতি। এক সময় বিদেশিরা আমাদের অপরাধ প্রবণ তকমা দিয়েছিল, এখন সেই বিদেশি লোকজন আমাদের শিল্পের প্রসঙসা করেন, জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান "।




সত্যি বলতে কি ঝাড়গ্রাম ট্রাফিক পুলিশ বা আপনার ওখানকার বেড়ানোর গাড়ীর ড্রাইভার বা স্থানীয় অনেক লোকই এই রূপকথার গ্রাম সম্পর্কে অবগত নয়। হতাশ হবার কিছু নেই। ঐ গ্রাম তো রয়েছে _____ শুধু মাত্র লোকচক্ষুর অন্তরালে তিলে তিলে গড়ে উঠছে সেই রূপকথা।




ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। অনেকেই হারিয়ে যেতে আসছেন এই কাজুবাদাম আর আকাশমনির জঙ্গলের ভেতর। ইচ্ছে হলে আপনিও কিছুদিন কাটিয়ে যেতে পারেন। বাংলার লোকজীবন আর ছবি যদি আপনাকে আকর্ষন করে -------- এই গ্রামের হাতছানি তাহলে আপনি কিছুতেই এড়াতে পারবেন না।









Thursday, 11 March 2021

ডাবুক -- বীরভূমের অচেনা এক শৈবতীর্থ

 ডাবুকেশ্বর শিবমন্দির---- ডাবুক---- বীরভূম




যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন,  যাঁরা বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে বাংলাকে সঠিক ভাবে চিনতে চান, তবে সাপ্তাহিক ছুটিতে একটা ছোট্ট ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পরুন পায়ে পায়ে বাংলাকে দেখবার জন্য। এতে রোজকার হাপিয়ে উঠা জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি পাবেন। পারবেন ইচ্ছামতন বাংলার গ্রামের তাজা বাতাস গ্রহন করে নিজের জীবনী শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে। চলুন যাই বীরভূমের এক গ্রামে যার নাম  ডাবুক। 




এটি হ'ল বীরভূমের প্রত্যন্ত এক গ্রাম।  বীরভূমের খ্যাতি শক্তিপীঠ হিসাবে। শক্তিপীঠ হিসাবে বীরভূমের খ্যাতিলাভ করলেও শৈবতীর্থ বক্রেশ্বর ছাড়া আরও অনেক শৈবতীর্থ বীরভূমে বিরাজ করছে যার মূল্য কম নয়। এইসব তীর্থস্থানগুলি যেমন প্রাচীন,  তেমনই ঐতিহ্য মন্ডিত। এরকমই এক প্রচারবিহীন অথচ ঐতিহ্য পূর্ণ প্রাচীন মন্দির ডাবুকেশ্বর শিবমন্দির যেটি এই ডাবুক গ্রামে অবস্থিত। আবার বাবা মহাদেব এখানে উন্মত্তেশ্বর নামেও পরিচিত। 
 
বীরভূমের সর্বোচ্চ শিবমন্দির এটি। এই রকম অজ গায়ে এরকম শিবমন্দির অথচ তার মাথায় বীরভূমের সবচেয়ে উঁচু  মন্দিরের তকমা। প্রায় ৮০ ফুট উচু মন্দিরটি গম্ভীর,  একাকী ও উদাসীন।  আবার খুব অল্প কথায় বলা যায়___ এ এক অনন্য এবং অদ্বিতীয়। তারাপীঠ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্ত তারাপীঠ তারা মায়ের সৌজন্যে আজ যতটা যমযমাট , ঠিক ততটাই নিষ্প্রভ এই ডাবুকেশ্বর শিবমন্দির। 




তবে এবার যেনে নেওয়া যাক  এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনের ইতিহাস।  কেউ কেউ বলেন-------- কৈলাশানন্দ স্বামী নামে এক সন্ন্যাসী ছিলেন ডাবুকেশ্বরের পরম ভক্ত।  তিনি দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন এবং দু এক বছর পর ফিরে এসে বাবার ভাঙ্গা মন্দিরে পড়ে থাকতেন।  শেষ জীবনে কৈলাশানন্দ স্বামী তাঁর আজীবন ভিক্ষালব্ধ ও সঞ্চিত লক্ষাধিক টাকায় ডাবুকেশ্বর মন্দির,  বাঁধানো  প্রাঙ্গন,  অতিথিশালা সব কিছু তৈরি করেন।  " সাধারণত  সন্ন্যাসীরা সাধারণ মানুষের মত সঞ্চয়ী হয় না "------তাই এই কাহিনী বিশ্বাস করতে অনেকেই   দিধা বোধ করেন।   অপর কাহিনীটি হ'ল----- কাশ্মীরের 
রাজমহিষী নি:সন্তান ছিলেন। কৈলাশানন্দ স্বামীর নির্দেশ মতো রাজমাতা ডাবুকেশ্বর শিবের নিকট সন্তান কামনা করেন এবং পুত্র সন্তান লাভ করেন। আনন্দিত ও যারপরনাই খুশি হয়ে মহারাজা প্রাচীন মন্দিরের পরিবর্তে ১২৮৭ বঙ্গাব্দে নতুন মন্দি্র তৈরি করে দেন।



পুরান ঘাটলে এইরকম জানতে পারি ..... পান্ডবদের অঞ্জাত বাসের সময় পান্ডবরা  ডাবুক গ্রামে এসে উপস্থিত হন, কিন্ত ডাবুকের গ্রামবাসীদের থেকে যথাযথ আতিথেয়তা না পাওয়ায় কুন্তী শিব কে অভিশাপ দেন "  আমার যেমন অন্ন জোটেনি  তেমনই তোমারও জুটবে না। "  এই কারনে বহুদিন এই উন্মত্তেশ্বর বাবার পূজা বন্ধ ছিল। পরবর্তীকালে বামাক্ষ্যাপার গুরুদেব বাবা কৈলাসপতি স্বপ্নাদেশ পেয়ে পূজা পুনরায় চালু করেন। বাবা কৈলাসপতি এখানেই সাধনা করেন এবং তাঁর দর্শন করবার জন্য বামদেব মাঝে মাঝে এখানে পদার্পণ করতেন।

এই মন্দিরের শিবলিঙ্গ পাতালভেদী | মাটির প্রায় ৪০ ফুট নীচে গর্ত খুঁড়েও এর তল পাওয়া যায় নি | এখানে বাবার অন্নভোগ হয় | লাগোয়া মন্দিরে বাবা কৈলাসপতি ,মা আনন্দময়ী  তারা মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে | তারা মায়ের এখানে নিত্য আমিষ ভোগ হয় |

মন্দিরটির গঠনশৈলী বাংলার চারচালা রীতির হলেও প্রবেশ ও আবেষ্টনীর কাজ সদূর কাশ্মীরকেই মনে করিয়ে দেয়। একদা এই মন্দিরের ব্যায় নির্বাহের জন্য বার্ষিক ৬০০ টাকা বৃত্তির বরাদ্দ করেছিলেন কাশ্মীররাজ। এই মন্দিরের প্রধান উৎসব শিবরাত্রি ও চড়ক। শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে সপ্তাহব্যাপী একটি মেলা বসে ও প্রচুর লোকের সমাগম হয়। 

এই গ্রামের অবস্থান তারাপীঠের থেকে বেশী দূরে নয়। প্রায় ১৫-১৬ কি মি হবে। রামপুরহাট-সাইথিয়া বাসে শাসপুরে নেমে টোটো, অটো বা ভ্যান রিকশায় এই গ্রামে যাওয়া যায়। অথবা তারাপীঠ থেকে সরাসরি গাড়ি করে এখানে চলে আসতে পারেন। দুপাশের গাঢ় সবুজ ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে রাঙ্গা পথটি চলে গিয়েছে অনেক  দূর। গাছপালার ফাক ফোকর দিয়ে দু একটা বাড়ির আভাস পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে খেত শেষ হয়ে গিয়ে এবরো খেবরো মেঠো পথ। পথের পাশে পুকুরে হাঁসেদের ডুব দেওয়া বা গুগলি তোলা বা সারিবদ্ধ ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে আপনার  মনে হবে___ জলে যেন কেউ আলপনা দিয়ে দিয়েছে। মনে হয় এ পথ যেন শেষ না হয়। কিন্ত এসব দৃশ্যের অবসান হয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠে ডাবুকেশ্বর শিবমন্দির। গ্রামেবাংলার বৈশিষ্ট্যহীন সাদামাটা এক গ্রামে নিভৃতে একাকী সবার অলক্ষে প্রচারবিহীন হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে এই মন্দির। 

অপূর্ব সুন্দর  শান্ত এই স্থানে গিয়ে  বাবা ডাবুকেশ্বর  তারা মায়ের দর্শন করে প্রসাদ পেতে পারেন। |








Saturday, 13 February 2021

চিল্কিগড়ের মা কনক দুর্গা, ঝাড়গ্রাম

 

চিল্কিগড়ের মা কনক দুর্গা।




পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম। ঝাড় ও গ্রাম .... এই দুই শব্দের মেলবন্ধনে সৃষ্টি ঝাড়গ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই ঝাড়গ্রাম শহর থেকে জামবনি যাবার রাস্তায় প্রায় ১৬ কি মি দূরে ডুলুঙ নদী। নদীর পূর্ব তীরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে গাছ গাছালিতে ঘেরা এক মনোরম স্থানে কনক দুর্গা মন্দির। আর পশ্চিম তীরে রয়েছে চিল্কিগড় রাজবাড়ী। শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরে এই মন্দিরের অবস্থান। দেবী এখানে অশ্বারোহিনী চতুর্ভূজা।



শোনা যায়, কনক দুর্গা আদিতে ‌ মন্ডিত ছিলেন না। তিনি ছিলেন বনের মধ্যে গাছের নিচে বনদুর্গা বা বনচন্ডী। ঘোড়া তার বাহন , হাতি তাঁর সাথি। বনবাসী মানুষের বিপদে আপদে তিনি ছিলেন তাদের পরিত্রাতা। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, আনুমানিক ১৭৪৯ সালে জামবনির রাজা গোপীনাথ সিংহ বনের মধ্যে মত্তগজ বনদুর্গার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে জগদীশ চন্দ্র ধবলদেব বনদুর্গাকে কনকদুর্গায় পরিনত করেন এবং নতুন মন্দির নির্মাণ করে দেন। কথিত আছে ধলভূমগড় রাজবংশের সঙ্গে একবার জামবনি রাজবংশ শরিকী মামলায় জড়িয়ে পরেছিলেন। তখন জামবনির রাজা জগদীশ চন্দ্র ধবলদেব বনদুর্গার কাছে গিয়ে মানত করেন যে, দেবীর কৃপায় যদি তিনি মামলায় জিততে পারেন, তাহলে তিনি বনদুর্গাকে কনকমন্ডিত করে নতুন মন্দিরে স্থাপন করবেন। জাগ্রত বনদেবীর মাহত্যে তিনি মামলায় জয়লাভ করলেন। রাজার যেমন কথা তেমন কাজ। এমন সময়ে দেবী নাকি স্বপ্নে রাজাকে চতুর্ভূজা মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন। রানি নিজের হাতের কঙ্কন খুলে দিলেন মায়ের স্বর্নমূর্তি গড়ার জন্য। রাজা সেইমত রানির হাতের সোনার কঙ্কন দিয়ে কনক দুর্গার মূর্তি গড়িয়ে নতুন মন্দির নির্মান করে তাতে দেবীকে স্থাপন করেছিলেন। দেবী এখানে চতুর্ভুজা এবং অশ্ববাহিনী। ঊরিষ্যার শতপথী ব্রহ্মণরা এই দেবীর পুরোহিত। 




বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে সোনার তৈরি কনকদুর্গার আদি মূর্তি চুরি হয়ে গেলে নতুন অষ্টধাতুর মূর্তি তৈরি করে স্থাপন করা হয়। সেটিও চুরি হয়ে গেলে ২০১১ সালে বর্তমানের পিতলের দেবী মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। কনকদুর্গার প্রাচীন পূর্ব মুখী মন্দিরটি ধ্বঙশের কবলে পড়ায় সেটির সঙস্কার না করে ১৯৩৭ সালে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু দখিনমুখি একটি মন্দির নির্মান করা হয়েছে। নূতন মন্দিরের গঠন উড়িষ্যার রেখ দেউলের মতন। প্রাচীন মন্দিরের সাথে নূতন মন্দিরের কোনো মিল নেই।





ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড় এই বনাঞ্চলে অর্জুন, নিম, বাবলা, বকুল, কদম, পলাশ, কনকচাঁপা, কুচিলার মত গাছ আর তাদের গায়ে পেঁচানো কাঞ্চন, রক্তপিতা, আতাড়ি প্রভৃতি কাষ্ঠল লতার সমারোহে গঠিত হয়েছে এক সঙরখিত পবিত্র অরন্য। কনকদুর্গা মন্দির সঙলগ্ন প্রায় ৬৮ একর বনভূমি সম্পূর্ণ ঔষধি গাছ দিয়ে ঘেরা। তাই সমগ্র ভারতের উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা ঔষধ গবেষণার কাজে এই বনভূমিতে আসেন। এই মন্দিরের একটু দূরেই বহুপ্রাচীন নাক্সভোম গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। পূর্বে রাজা গোপীনাথ এর পরবর্তী উত্তরসূরীরা আয়ুর্বেদিক স্বাস্থ্য চর্চায় বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাই এই রাজারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে এমনকি বিদেশ থেকে ঔষধি বৃক্ষ সঙগ্রহ করে এই ঔষধি বনভূমি তৈরি করেছিলেন। উদ্ভিদ গবেষকদের মতে প্রায় ৪৩০ টি প্রজাতির ঔষধি বৃক্ষ এই বনভূমিতে পাওয়া যায়। এছাড়া নানা প্রজাতির সরীসৃপ, ইঁদুর, বনবিড়াল, হনুমান প্রভৃতির সাথে ডাহুক, টিয়া, বুলবুলি, কোকিল, কুব্ কুব্ আর বউ কথা কও পাখির দেখা মেলে এই অভয়ারণ্যে। সমগ্র মন্দির এলাকাটি চিল্কিগড় রাজ পরিবারের দেবত্তোর সম্পত্তি হলেও বর্তমানে তার দেখভালের দায়িত্বে আছে মন্দির উন্নয়ন কমিটি।





কলকাতা থেকে চিল্কিগড়ের দূরত্ব প্রায় ১৮২ কি মি এবং ঝাড়গ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ১৬ কি মি। ঘন শাল- পিয়ালের অরন্যে ঘেরা চিল্কিগড় শুধু ভারতীয় নয় , বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বেড়াবার এক আদর্শ স্থান।