Sunday, 1 August 2021

ঝাড়গ্রাম রাজার বাড়ি

 


ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ী সম্বন্ধে দু চার কথা ::

বর্তমান ঝাড়গ্রাম শহরের রূপকার জঙ্গলমহলের প্রাচীন রাজার আধুনিক প্রাসাদ পর্যটকদের কাছে শহরের সবথেকে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। মল্লদেব রাজপরিবারের প্রায় চারশো বছরের প্রাচীনতার স্মৃতি বহন করে চলেছে। ১৯৩১ সালে ঝাড়গ্রামের তৎকালীন রাজা নরসিংহ মল্লদেব গথিক শিল্পরীতিতে বর্তমান প্রাসাদটি নির্মাণ করে ছিলেন। প্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল রাজপুত স্থাপত্যশৈলীর সাথে ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রনে। পুরোনো রাজবাড়ী গড়ে উঠেছিল মোটামুটি সেই ৪০০ বছর আগে। এখন সেটি রয়েছে নতুন রাজবাড়ী ও গেষ্ট হাউজের পিছনে। বর্তমান রাজ পরিবারের সদস্যরা এই নতুন প্রসাদের দোতলায় বসবাস করেন। একসময়ে এই রাজপরিবারের আতিথ্য গ্রহন করেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল উইলিঙডন, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী , প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, পশ্চিবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়, কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তমকুমার এবং পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্টরা।



ঝাড়গ্রামে এই মল্লদেব রাজপরিবারের রাজ্য স্থাপনের ঘটনা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি কাহিনী প্রচলিত আছে। যদি মুঘল যুগের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করা যায় তবে দেখতে পায় ১৫৭০ সাল নাগাদ দিল্লির সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলায় আসেন রাজপুতনার বীর যোদ্ধা সর্বেশ্বর সিং চৌহান। ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে তখন শাসন করতেন মাল রাজারা। তাঁদের রাজ্য ছিল জঙ্গলে ভর্তি। রাজ্যের নাম ছিল ঝাড়িখন্ড। সর্বেশ্বর সিং চৌহান পদাতিক আর অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে মাল রাজাকে উচ্ছেদ করে মল্লদেব উপাধি ধারণ করেন এবং প্রতিষ্ঠা করলেন নতুন রাজবংশের। রাজধানী হল ঝাড়গ্রাম। তারপর চার শতাব্দী ধরে তাঁর বঙশের ১৮ জন রাজা এখানে রাজত্ব করেছেন।


আবার এও শোনা যায় ..... ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমদিকে ফতেপুর সিক্রি‌ অঞ্চলের ছেত্রি পরিবারের এক সন্তান সর্বেশ্বর মল্লদেব গিয়েছিলেন শ্রীখেত্রে জগন্নাথ দর্শন অভিলাষে। এই সময়ে তাঁর পেছনে পেছনে তাঁদের কুলদেবী সাবিত্রী দেবীও খাড়া হাতে আসতে থাকেন। শ্রীখেত্র থেকে ফেরার সময় সর্বেশ্বরের সন্দেহ হয় যে তাঁকে কেউ অনুসরন করছে। পিছনে তাকাতেই অপ্রস্তুত সাবিত্রী দেবী পাতালে ঢুকে যেতে থাকেন। রাজা ছুটে গিয়ে দেবীর চুলের মুঠিটি ধরে ফেলেন। তাই দেবীর শরীর পাতালে আর মাথার চুল এবং হাতের খাড়াটি উপরে থেকে যায়। ‌অবসন্ন রাজা গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের মধ্যে তিনি এখানে রাজত্ব স্থাপনের জন্য সাবিত্রী দেবীর আদেশ পান। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে সর্বেশ্বর সিং এই জঙ্গলভূমির মাল বা মল্ল রাজাকে পরাজিত করে রাজত্ব স্থাপন করেন এবং সাবিত্রী দেবীর মন্দির নির্মাণ করেন। রাজার নিযুক্ত ব্রাহ্মন পুরোহিতরা যজমানের কুলকাহিনি এভাবেই রচনা করে প্রচার করেছেন


ঝাড়গ্রাম রাজবংশে জ্যেষ্ঠত্বের অধিকার প্রথা অনুসৃত হয়। সবচেয়ে বড় রাজপুত্রকে যুবরাজ, দ্বিতীয় পুত্রকে হিকিম , তৃতীয় পুত্রকে বড়ঠাকুর, চতুর্থ পুত্রকে কুমার, পঞ্চম পুত্রকে মুসারেন এবং অবশিষ্টদের বাবু বলা হতো। ১৮৫৭ সালে রঘুনাথ মল্লদেব অপ্রাপ্তবয়ষ্ক থাকাকালীন রাজা হয়েছিলেন।   ১৮৮৬ সালে রঘুনাথ প্রাপ্তবয়ষ্ক হয়ে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কয়েক বৎসরের মধ্যে প্রায় ৬ লখ্খ টাকা রিনগ্রস্ত হয়ে পরেন। ১৯১২ সালে রঘুনাথের এবং ১৯১৬ সালে তাঁর পুত্র চন্ডীচরনের মৃত্যু হয়। চন্ডীচরনের সাত বছরের শিশু নরসিংহ ইংরেজ সরকারের তত্ত্বাবধানে মেদিনীপুরে পড়াশুনা করেন এবং মেদিনীপুর কলেজের শিক্ষক দেবেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্যকে নরসিংহর অভিভাবক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯২৯ সালে নরসিংহ সাবালক হয়ে এস্টেটের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন এবং দেবেন্দ্র মোহন কে ম্যানেজার নিযুক্ত করেন।



ঝাড়গ্রাম রাজাদের আরধ্য দেবী হলেন সাবিত্রী দেবী। সাবিত্রী দেবী প্রাচীন শাক্ত দেবী। তাঁদের প্রাচীন মন্দিরটি নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর রাজবাড়ীর কাছে বর্তমান মন্দিরটি করা হয়েছে।

এই বঙশের রাজারা দানশীলতা, প্রজাবাৎসল্য এবং সমাজসেবা মূলক কাজের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। রঘুনাথ নিজে ছিলেন যথেষ্ট বিদ্যোৎসাহী গুনী রাজা। তিনিই ছিলেন ঝাড়গ্রামের প্রথম এফ এ পাশ। নরসিংহ মল্লদেব ঝাড়গ্রাম শহরের জলকষ্ট দূর করার জন্য কল বসিয়ে ছিলেন, শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুল কলেজ স্থাপনের জন্য ভূ-সম্পত্তি দান করেছিলেন। 


জঙ্গলমহলের প্রানকেন্দ্র ঝাড়গ্রামে সুপ্রাচীন অতীতে যেভাবেই মল্লদেব বঙশ রাজত্ব কায়েম করুক না কেন পরবর্তীকালে এই বঙশের রাজারা তাঁদের প্রজাদের কল্যানে প্রশঙনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঝাড়গ্রাম রাজপরিবারই প্রকৃত অর্থে বর্তমান ঝাড়গ্রামের রূপকার।






Sunday, 20 June 2021

রীঁ মা নলাটেশ্বরী

 

সতীপীঠ...... নলাটেশ্বরী মাতা মন্দির  ..

....  নলহাটি ...... বীরভূম....




রাঢ় বাংলার  লাল রুক্ষভূমি বীরভূম।  বীরভূমের অউল-বাউল-ফকির-পীর-দরবেশ-সাধু-সন্ত-সাধক ও পঞ্চপীঠ খ্যাত অতীতের নলহাটি কালিন্দীপুর গ্রাম নিয়ে আজকের পৌর শহর নলহাটি। এই ভূ-খন্ডে রয়েছে ছোটনাগপুরের মালভূমির গন্ধ। পঞ্চপীঠ খ্যাত এই জেলার উত্তরে অবস্থান করছেন নলহাটিতে সতীপীঠ দেবীপীঠ মা নলাটেশ্বরী। সতীর নলা পরেছে বলেই এখানকার নাম নলহাটি। দেবীকে কেউ বলে কালিকা, কেউ বলে দেবী পার্বতী। মন্দির গাত্রে রয়েছে গুপ্ত স্থাপত্যের নিদর্শন,  চার চালা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রস্তর খন্ডে 
মহাদেবীর কালিকারূপী " মা নলাটেশ্বরী "। একান্নটি সতীপীঠেই স্বয়ং মহাদেবী ভগবতীর  নানা রূপে   অধিস্্ঠতা। এখানে প্রতিষ্ঠিত   দেবীর নাম শেফালিকা ও এখনের ভৈরব  হলেন  যোগীশ। স্থানীয়  লোকেরা মাকে ললাটেশ্বরী বলে ডাকে।  স্থানীয় অনেকই জানেন   না এটি সতীপীঠের  একটি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মধ্যে মা নলাটেশ্বরীর মন্দির।  চার চালা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রস্তর খন্ডে মহাদেবীর কালিকারূপী " মা নলাটেশ্বরী "। একান্নটি সতীপীঠেই স্বয়ং মহাদেবী ভগবতী নানা রূপে অধিষ্ঠিতা। নলহাটিতে প্রস্তর খন্ডে কালিকা রূপী মহাদেবীর মূর্তি, সিন্দুর চর্চিত মুখমন্ডল, মাথায় চাঁদির ছাতা, সুদীর্ঘ  ভ্রু, ত্রিনেত্র, বিকাশিত দন্ত, নাক, চিক্কন ললাট, এলোকেশী কালিকারূপী সতীমা তথা দেবী ভগবতী। মুখের নীচেই রয়েছে মহাসতীর কন্ঠনলী। নলীতে যতই জল ঢালা হোক না কেন জল কখনই উপচে পড়ে না। আবার দীর্ঘক্ষণ জল না ঢাললেও নলীতে জল একই জায়গায় রয়। এ কেবল সকালে স্নানের সময় দেখা যায়। জল ঢালার সময় ঢোক গেলার আওয়াজ হয়।  চোখের পাতা নেই।  অশুভ শক্তি বিনাশ করার জন্য সদা জাগ্রত।  ঘন জঙ্গলের ভেতর একটি অদ্ভুত ধরনের প্রাচীন বট গাছের নীচে মায়ের আবির্ভাব।  এখানে দেহের আরাম , মনের শান্তি, কামনা-বাসনা খুঁজে পাওয়া যায়। 








পুরান আখ্যান এবং পীঠ নির্নয় গ্রন্থ থেকে জানা যায় প্রজাপতি দক্ষের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহামায়া দক্ষপত্নী অসিক্লীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সতী। সতী ছোটবেলা থেকে মহাদেব শিবকে পতীরূপে গ্রহন করেন। ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় সতী ও শিবের বিবাহ হয়। বিবাহের কিছুকাল পরে নৈমিষারণ্যের এক যঞ্জসভায় দক্ষ উপস্থিত হলে শিব তাকে উপযুক্ত সন্মান না দিলে দক্ষ অপমানিত বোধ করেন।  অপমানিত দক্ষ নিজ বাড়িতেই মহাযঞ্জের আয়োজন করেন এবং শিবকে নেমতন্ন করেন না। শিবের বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও সতী বিনা নিমনন্ত্রে পিতা আয়োজিত যঞ্জস্থলে যান।  সতীর দশ রূপ দেখে শিব মৌন থাকেন।  দক্ষ সতীকে লক্ষ্য করে যঞ্জস্থলে শিব নিন্দা করতে থাকেন।  পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে যঞ্জাগ্নিতে আত্মাহুতি দেন। ফল হয় ভয়ংকর। শিব রূদ্রমূর্তি ধারণ করে দক্ষের যঞ্জ লন্ড ভন্ড করে দেন। শিবের অন্যতম চর দক্ষের মুন্ড ছেদ করেন।  শিব রাগে দু:খে হিতাহিত ঞ্জান শূন্য হয়ে সতীর প্রানহীন দেহ কাধে তুলে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। সৃষ্টি বিলুপ্ত হওয়ার মত অবস্থা হয়। সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা এবং পালন কর্তা বিষ্ণু কৌশলে শিবকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্রের দ্বারা সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেয়। সতীর এই দেহ খন্ড একান্নটি স্থানে পড়ে একান্নটি সতীপীঠের সৃষ্টি হয়েছে। পীঠ অর্থ আসন বা স্থান।  


অন্যমতে ১৪০০ বৎসর আগে স্বপ্নাদেশ পেয়ে অগেকার পাটলিপুত্র থেকে এসে গৃহী সাধক রামশরণ শর্মা সতীমায়ের কন্ঠনলী আবিষ্কার করেন।  পূজা অর্চনা শুরু করেন।  যাগ যঞ্জ করে সতীমাকে জাগ্রত করেন।  করেন নিত্য পূজার ব্যবস্থা। তিনি ছিলেন নি:সন্তান। দেবী তাকে বর দিতে চান।  তিনি সন্তান কামনা করেন।  মহাদেবী ভগবতী তাকে বর দেন " দুটি সন্তানের জন্ম হবে। তবে একটি সন্তান মাকে উৎসর্গ করতে হবে।" যথা দুুুটি সন্তান   হয়। কামদেব ও বামদেব। কামদেব  উৎসর্গিত হয়ে এখানে এসে নিয়মিত মায়ের পুুুুজা অর্চনা শুরু করেন। সেই থেকে দেবীর  জনমানসে প্রচার শুরু হয় ।



প্রথম অন্নভোগ নিবেদন করেন  আষাঢ় নবমীতে কাশী থেকে এসে ব্রহ্মচারী কুশলানন্দ। আগে তারাপীঠ,  পরে ১২৯৬ সালে  এখানে এসে মায়ের চরণের কাছে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধিলাভ করেন।  মন্দিরের উত্তরে রয়েছে তাঁর সিদ্ধাসন। আর রয়েছে পাহাড়, খোদাই করা 8 ফুটের গনেশ মূর্তি ,   মা  ষষ্ঠী- নীম  গাছের নীচে। মূল মন্দির নির্মাণ করেন নাটোরের রাণীভবানী। অদূরে রয়েছে " যোগেশ ভৈরব"। ভৈরবের দেওয়ালে আপনা থেকেই উদ্ভব হয় " শ্রী বিষ্ণুর চরণ যুগল "। এই ঘটনাকে অনেকেই দৈবভাব মনে করে। শাক্ত ও দৈবভাব এখানে উপস্থিত।  স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অনুশীলন সমিতির সদস্য নগেন বাগচী বেশ কিছুদিন এখানে আত্মাগোপন করে মায়ের সেবা কর্ম করেন।  পরে পুলিশ তাড়া করলে তারাপীঠে বামাক্ষ্যাপার কাছে চলে যান।  দৈব আর এক ঘটনা -------- এই টিলা পাহাড়ে একটি নিম গাছ ছিল ---- তার পাতা পেরে খেলে মিষ্টি কিন্ত পাতাটি মাটি স্পর্শ করলে ভীষণ তেতো। মন্দিরের অদূরে ব্রাহ্মণী নদী। অরণ্য ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা।




এখানে আসা-যাওয়ার জন্য হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে সবসময় ট্রেন যোগাযোগ রুয়েছে। জাতীয় সড়ক ধরে বাস যোগাযোগ তো আছেই।  বর্গীসর্দার ভাস্কর পন্ডিত এই পাহাড়ের সমতল অংশে নিয়মিত ভাবে কিছুকাল ছিলেন।  তাই পাহাড়ের এক নির্দিষ্ট অংশের নাম  "বর্গীডাঙ্গা"। ইতিহাসের সাথে মিশে রয়েছে মন্দিরের গাম্ভীর্য আর কাহিনী। এছাড়াও রয়েছে নলাটেশ্বরী মাতা মন্দিরের পিছনে টিলা পাহাড়ে বনবাসকালে রামসীতার বিশ্রাম স্থলের বিভিন্ন নিদর্শন সহ রামসীতার মন্দির।  আর পাশেই রয়েছে ইসলাম ধর্মের বাবার ঈদগা ও মাজার। 

 বেলা ১টায় অন্নভোগ নিবেদন এবং সন্ধায় সন্ধারতি হয়। আজও এখনে পাঠা বলিদান প্রথা চালু আছে। রীঁ নলাটেশ্বরী মাতার পূজার প্রধান উপকরন --- চাঁছি সন্দেশ ও পেড়া সন্দেশ।  প্রত্যহ সূর্যোদয়ের পর মাতার স্নান ও কন্ঠনলী পরিস্কার সহ বিভিন্ন উপকরনে সাজানো হয়, তৎপরে মঙ্গল আরতি এবং পূজাপাঠ শুরু হয়। ঐ সময় উপস্থিত থাকলে দর্শন হয়। প্রত্যহ সকাল ৫-৩০মি থেকে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। তারপরে মাতার শয়ণ। ঋতু হিসেব সময়ের পরিবর্তন হয়। বর্তমান মন্দিরে আধুনিকতার ছাপ লেগেছে। তৈরী হয়েছে লজ এবং নানাবিধ পরিষেবার ব্যবস্থা।

রামেশ্বরের দ্বাদশলিঙ্গের মন্দির


 

মেদিনীপুর (বর্তমান ঝাড়গ্রাম)  জেলার নয়াগ্রাম থানার দেউলবাড় গ্রামে মন্দিরটি অবস্থিত। সুবর্ণরেখা নদীর একেবারে পাড়ের উপর প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে, নদীপৃষ্ঠ থেকে ১৫০ মিটার উচ্চতায় জঙ্গলাকীর্ণ জন বিরল স্থানে ওড়িষি ভাষ্কর্যে  মাকড়া পাথরে নির্মিত এই প্রাচীন শিব মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে একসঙ্গে বারোটি শিবলিঙ্গ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৩৪ লখ্খ টাকা ব্যয়ে মন্দিরটিকে সুসজ্জিত করেছে।

রোহিনী নিকটে বারাজীত মহাস্থান।

রাতে সীতা-রাম-লখ্ণ কৈলা বিশ্রাম।।

দুয়াদশ লিঙ্গ রামেশ্বর শম্ভুবর।

রঘুবঙশ কুলচন্দ্র পূজিলা বিস্তর।।

সপ্তদশ শতাব্দীতে ১৬৫৫ সালের মধ্যে রচিত "শ্রী শ্রীরসিকমঙ্গল" নামক জীবনীকাব্যে রামেশ্বর শিবের উল্লেখ আছে। এর বর্ননায় দেখা যায় যে রোহিনীর কাছে বারাজিত নামক স্থানে দ্বাদশলিঙ্গের অবস্থান। রামেশ্বরের কাছে বনের মধ্যে তপোবন নামে একটি মনরোম স্থান বাল্মীকির আশ্রম রুপে পরিচিত। সীতা-রাম-লখ্ন এই তপোবনে বাল্মীকির আশ্রমে বিশ্রাম গ্রহনকালে যে শিবলিঙ্গকে পূজা করেছিলেন, সেই রাম পূজিত শিবের নাম রামেশ্বর শিব।








পুরাতত্ত্ব গবেষকদের একাংশের মতে, একাদশ-দ্বাদশ শতকে ওড়িষার চোল গঙ্গদেবের রাজাদের আমলে মন্দিরটি তৈরি হয়। এই মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের প্রথম কিরণ মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে চারপাশে আলোকিত করে তোলে। 

একদিন ভগবান বিশ্বকর্মাকে ডেকে এক রাত্রির মধ্যে বাল্মীকির তপোবনের কাছে পুরী নির্মাণের আদেশ দিলেন___ মানুষ যাতে না যানতে পারে এমনভাবে পুরী তৈরি করতে হবে সকলের অগোচরে। তাই বিশ্বকর্মা রাত্রে মানুষ যখন ঘুমাচ্ছিলো তখন এখানে এসে স্থানীয় মাকড়া পাথর দিয়ে মন্দির গড়তে শুরু করেন।  বাইরে থেকে ভালো ভালো পাথর এনে মন্দির নির্মাণ যেহেতু এক রাত্রে সম্ভব নয়, তাই স্থানীয় মাকড়া পাথর ব্যবহার করেছিলেন।  মন্দিরের কাজ প্রায় শেষ করে প্রাচীরের কাজ  শুরু করেছেন,  এমন সময় শুনতে পেলেন যে চিড়াকুটিরা ঢেঁকিতে চিড়া কুটতে শুরু করেছে। বিশ্বকর্মা ভাবলেন, সকাল হয়ে গেছে, এবার লোকজন তাকে দেখে ফেলবে। ভয়ে তিনি মন্দিরের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে স্বর্গে ফিরে গেলেন।  কিন্ত তিনি জানতেন না, চিড়াকুটিরা সকাল হওয়ার এক প্রহর আগে উঠে নিজের ঘরে চিড়া কুটে।

সুবর্ণরেখা তীরে রামেশ্বর শিব ।

সূর্য কিরণে  দ্বাদশ লিঙ্গ স্নাত।।

মাকড়া পাথর জুরে কোন কারিগর।

গড়ে গেছে কাহিনী টিলার উপর। ।






স্বর্গে গিয়ে নিজের বোকামির জন্য ভগবানের কাছে বকুনি খেলেন।  এরপরে তিনি কোনো ঝুকি না নিয়ে সমুদ্রের নীচে বসে তৈরী করেছিলেন পুরীর মন্দির।  মন্দির নির্মাণ শেষ হলে সমুদ্রের জল সরে যায় এবং পুরীর মন্দির জেগে উঠে। দেউলবাড়ের অসমাপ্ত মন্দিরটি বিগ্রহহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। রামচন্দ্র যখন সীতাকে দ্বিতীয়বার বনবাসে পাঠালেন,  তখন সীতা এখানে এসে তপোবনে বাল্মীকির আশ্রমে ছিলেন।  এই  তপোবনেই লব ও কুশের জন্ম হয়েছিল।  তিনি প্রতিদিন লবকুশকে তেল হলুদ মাখিয়ে একটি ঝণর্ণার জলে স্নান করতেন বলে সেই ঝর্ণার জল হলুদ হয়ে গেছে। তপোবনে একটি অর্ধ-চেরা শাল গাছ "সীতা দাঁতন" নামে পরিচিত।  তপোবনে আছে একটি অনির্বাণ যঞ্জকুন্ড। প্রথা আছে, এই স্থান দিয়ে কেউ গেলে এক খন্ড কাঠ যঞ্জকুন্ড দিয়ে যেতে হয়। বনবাসে এসে বনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ সীতা স্বামী রামচন্দ্রের মঙ্গল কামনায় বিশ্বকর্মা নির্মিত অসমাপ্ত মন্দিরে শিবকে প্রকট হতে অনুরোধ করেন।  সতী সাবিত্রী সীতার প্রার্থনায় শিব সেই অসমাপ্ত মন্দিরে দ্বাদশ লিঙ্গ রূপে প্রকট হলেন।  সীতা প্রতিদিন স্বামী রামচন্দ্রের মঙ্গল কামনায় রামের ইষ্টদেবতা এই দ্বাদশ লিঙ্গ শিবকে পূজো করতেন বলে এর নাম রামেশ্বর শিব। 

মন্দির থেকে সুবর্ণরেখার বুকে।

নেমে গেছে সারিবদ্ধ পাথর সোপান। ।

এই শিব স্থাপন করে সীতা।

পূজ্য পাঠ বন্দনা - এখন জনশ্রূতি।।

মন্দিরের গর্ভগৃহ, জগমোহন, ভোগমন্ডপ এবং নাটমন্দিরের নিচু প্রবেশদ্বার চারটি, সমান্তরাল ভাবে এক সরলরেখায় এমন ভাবে নির্মিত যাতে প্রভাতে সূর্যের আলো মন্দিরের গর্ভগৃহে সোজাসুজি প্রবেশ করতে পারে। মন্দিরের গর্ভগৃহে দ্বাদশ লিঙ্গ শিবের অবস্থান।   গৌরীপীঠের অভ্যন্তরে কেবল শিব লিঙ্গের মাথাটি দেখা যায়। মূল লিঙ্গের উপরিতলে এগারোটি ছোট ছোট  লিঙ্গ,  কেন্দ্রে অবস্থিত একটি লিঙ্গকে বেষ্টন করে আছে।

মন্দিরের পিছনের দিকে ১০৮ টি পাথরের সিড়ি ধাপে ধাপে নেমে এসে শেষ হয়েছে একটি কুন্ডের পাশে। এটি কুন্ড পুকুর নামে পরিচিত।  এই কুন্ডে সারা বছর জল থাকে। কুন্ডের গা ঘেঁষে  একটি খাল বয়ে গিয়ে সুবর্ণরেখা নদীতে পড়েছে। 

রামেশ্বরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে আমাবস্যার অন্ধকার রাতে এখানে টিলার নীচে নদীর তীরে মেলা বসে মাঘ মাসে শিবরাত্রি উপলক্ষে । এটা কম আশ্চর্যের নয়। এখানে এসে শিবের ব্রতচারিনীরা মন্দির চত্বরে প্রদীপ জ্বেলে রাত জাগেন। তাছাড়া অন্য মেলার মতোই হরেক দ্রব্যের দোকানে মেলা বিশাল আকার ধারণ করে। মেলাটির অন্যতম আকর্ষণ হল অ-আদিবাসীদের সঙ্গে আদিবাসী পুরুষ ও রমণীর বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহন।  সারা রাত্রি ব্যাপী মেলায় আদিবাসী নৃত্য-গীত এবং সাঁওতালী যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। নয়াগ্রাম এলাকায় অন্য কোনো বড় মেলা না থাকায় সকল শ্রেণীর মানুষ যে এই মেলায় এক রাত্রির আনন্দের জন্য আসে, সে কথা নি:সংশয়ে বলা যায়। রামেশ্বরের শিবরাত্রীর মেলাটি এই এলাকার সাংস্কৃতিক মিলন-মিশ্রন ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 



⭐বিশেষ আকর্ষণ_
১) মন্দিরটি

২) মন্দিরের গায়েই ৪০০ বছর পুরনো কাঁঠাল গাছ! (গাছটি পূজিত হয়)
৩)৬ মাথা বিশিষ্ট কার্তিক ঠাকুর।(মন্দিরের গায়েই খোদাই করা)
৪)ম্যাকডা পাথরের থম্বি।
৫) সুবর্ণরেখা নদী
৬) শিব রাত্রির মেলা।
৭) শাল জঙ্গল
৮) প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে পূজো হয় দুপুর পর্যন্ত।  সব্জি চাল নিয়ে
 গেলে প্রসাদ করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা আছে এবং প্রসাদের স্বাদ অনন্য। 



সড়কপথে কলকাতা থেকে NH 6 ( মুম্বাই-কলকাতা মহাসড়ক ) ধরে ঝাড়গ্রামে পৌচ্ছাতে সময় লাগে প্রায় চার ঘন্টা। ঝাড়গ্রাম থেকে গোপীবল্লভপুর ৪২ কিমি। গোপীবল্লভপুর থেকে জঙ্গলের পথ ধরে ২৩ কিমি এগোলেই দেউলবাড়ের রামেশ্বর শিব মন্দির।







 এছাড়া হাওড়া থেকে খড়্গপুর স্টেশনে পৌচ্ছাতে এক্সপ্রেস/ লোকাল ট্রেন আছে।  সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টা ২৪ মিনিট। এখান থেকে সহজেই ঝাড়গ্রাম আসা যায়।


তপোবনে বাল্মীকির আশ্রম

 


বাল্মীকির  আশ্রম  ---- তপোবন 





যে বনে মুনিঋষিরা তপস্যার জন্য বাস করতেন,  সে বনই হলো তপোবন ।  তপোবন কোনোও নির্দিষ্ট জায়গার নাম নয়। তপস্যাসাধনের বনই হ'ল তপোবন।  পুন্যভূমি ভারতবর্ষে কতই না আছে তপোবন।  ভারতবর্ষ মুনিঋষিদের দেশ। যেখানেই সত্যদ্রষ্টা মুনিঋষিদের আশ্রম স্থাপিত হয়েছে বা পুন্যাত্মা মুনিঋষিদের বানী বর্ণিত হয়েছে, সেটিই তপোবন বলে নামকরন হয়েছে। এখানে যে তপোবনের কথা বলতে চলেছি _____ এ তপোবন রত্নাকর দস্যুর তপোবন।  ভয় পাবার কিছু নেই।  কেননা আজ কোনো দস্যুও নেই,  আর সেজন্য লুটপাট হবারও কোনো ভয় নেই। তবে বনের মধ্যে , আপনার ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন থাকে , তবে  হাতির পালের দেখা মিলতেও পারে। এ দেখে আপনি মজা পাবেন না ভয় পাবেন সেটি আপনার নিজস্ব ব্যাপার।  





ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিমি দূরে দেউলবাড় গ্রামে গেলে দেখতে পাবেন রামেশ্বর শিব মন্দির।  সেই শিবমন্দির থেকে ৭ কিমি দক্ষিনে সুবর্ণরেখা নদীর ধারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে অপরূপ সুন্দর এক জায়গা ----- বাল্মীকির তপোবন। হাত বাড়ালেই সুবর্ণরেখা নদী। আর জঙ্গলের রূপকে তো এককথায় অপরূপ বলা যায়। খড়্গপুর,  মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম বা বেলদা থেকে কালো পিচের রাস্তা আর সবুজ শাল গাছের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিংবা সবুজ জঙ্গল আর রঙ্গিন মোরামের রাস্তা ধরে চলতে চলতে আপনি কখন যে পৌচ্ছে যাবেন নিজেও বুঝতে পারবেন না। সড়কপথে চড়াই উতড়াই হলেও  এ পথের শোভা আর তাজা অক্সিজেন পাওয়ার আনন্দ,  আমার মনে হয়, আপনার চিরকাল মনে থাকবে।



বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।  আর বিশ্বাসই ভারতীয় সভ্যতার প্রানভোমরা। এই বিশ্বাসেই ভারতবর্ষের সর্বত্র রামায়ণ মহাভারতের অধিষ্ঠান। রামচন্দ্র,  সীতা ও লক্ষনের সাথে বনবাসে যাওয়ার  পথে বাল্মীকির তপোবনে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন।  এখান থেকে পঞ্চবটী বনে গিয়ে  কুটির  তৈরি করে থাকলেন।  রাবণ সেখান থেকে সীতাকে চুরি করে। সীতাকে রাবনের হাত থেকে উদ্ধার করে চৌদ্দ বছর পরে রাজ্যে ফিরে এসে রামচন্দ্র যখন রাজা হয়েছিলেন,  তখন প্রজারা গর্ভবতী সীতার চরিত্রে সন্দেহ প্রকাশ করেন। রামচন্দ্র প্রজাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সীতাকে পরিত্যাগ করেন।  লক্ষণ সীতাকে পুনরায় অরন্যে বাল্মীকির তপোবনে রেখে আসেন।  কিছুকাল পরে সীতার দুই জমজ সন্তান  লব ও কুশ জন্মগ্রহণ করেন। তারা বাল্মীকি মুনির কাছে সর্ব শাস্ত্র অধ্যয়ন করে এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হন। এই সময় রামচন্দ্রের অশ্বমেধের ঘোড়া যখন এই স্থান দিয়ে যায়, তখন লব-কুশ সেই অশ্বকে ধরে রাখে  । ফলে রামচন্দ্র ও তাঁর তিন ভাইয়ের সাথে তাদের প্রবল যুদ্ধ হয়। লব-কুশের কাছে তারা সকলেই পরাজিত হয়ে চেতনা হারান।  খবর পেয়ে সীতা ছুটে আসেন  এবং এসব দেখে কান্নাকাটি আরম্ভ করেন। সীতার কান্না শুনে বাল্মীকি মুনি আসেন ও  মন্ত্রপুত জল ছিটিয়ে তাদের চেতনা ফেরান । লব-কুশকে অশ্বমেধের ঘোড়া ছেড়ে দিতে বলেন।  বাল্মীকির কথায় লব-কুশ ঘোড়া ছেড়ে দেন।



সীতানালা নামে একটা ছোট অরন্য ঝর্ণা তিন দিক থেকে তপোবনকে ইউ-এর মতো ঘিরে রয়েছে। আর একদিকে সুবর্ণরেখা নদী। কথিত আছে, বনবাসে থাকার সময়ে সীতা এই নদীতে স্নান করতেন বলে এই নদীর নাম সীতানালা। তপোবনে ঢোকার জন্য খালের উপরে এখন কংক্রিটের সেতু হয়েছে। আগে কাঠের সেতু ছিল।  সেতু পেরিয়ে একটু এগোলেই মহর্ষি বাল্মীকির সমাধি। সমাধির নিচ থেকে মাকড়া পাথর সাজিয়ে উড়িষ্যার রেখ দেউল রীতিতে একটি ছোট মন্দির চূড়া তৈরি করা হয়েছে। সমাধির উপরে একটি লম্বা-লম্বি চেরা শালগাছ রামধনুর মত দুপাশে মটি স্পর্শ করে আছে। এই শালগাছটির নাম হল সীতা দাঁতন।  সীতা নাকি শাল দাঁতনে দাত মাজার পরে দাঁতন চিরে জিভ ছুলে ফেলে দিলে এই গাছের জন্ম হয় বলে এর নাম সীতা দাঁতন।  সমাধির পাশেই একটা বেদির উপরে একটা হোমকুণ্ড আছে যার আগুন রাতদিন জ্বলতে থাকে। কেউ বলেন  বাল্মীকির হোমকুণ্ড। আবার কেউ একে সীতাধুনি বলে সম্বোধন করেন। সীতার গর্ভে লব-কুশ জন্মানোর পর আঁতুড়ের পাশে সীতাদেবী শিশুদের উষ্ণতা প্রদানের জন্য এই ধুনি জ্বেলেছিলেন, তাই এটা সীতাধুনি নামে পরিচিত। নিয়ম হচ্ছে, এখানে যেই আসুক না কেন বন থেকে এক খন্ড কাঠ এনে এই ধুনিতে দিয়ে যেতে হয়।



উত্তরে সীতানালা আর দক্ষিণে সীতাকুন্ড থেকে নির্গত হলুদ জলের ঝর্ণা তপোবনকে বেস্টন করে একসঙ্গে মিলিত হয়ে চলে গেছে সুবর্ণরেখার দিকে। জনশ্রুতি, সীতা এখানে তেল হলুদ মাখিয়ে লব কুশকে নিয়মিত স্নান করাতেন বলে জলের রং হলদে হয়ে গিয়েছে। বাল্মীকির সমাধির পাশেই রয়েছে একটা ছোট্ট মন্দির  যেখানে বাল্মীকি, রাম, লক্ষণ, সীতা, লব ও কুশের মূর্তি রয়েছে। একে সকলে বাল্মীকি মন্দির বলে। যেখানে লব-কুশ অশ্বমেধের ঘোড়া ধরেছিল তা এই আশ্রম থেকে প্রায় ৫ কিমি দুরে গভীর অরন্যের মধ্যে অবস্থিত। অরন্যের প্রবেশ পথের বাম দিকে একটি স্থানে একটা সিমেন্টের ঘোড়া তৈরি করে রাখা আছে। মনে হবে যেন এখানেই বাঁধা ছিল সেই অশ্বমেধের ঘোড়া। আশ্রমের একটু দূরেই  সীতানালা পাশেই রয়েছে তিলক মাটির পাহাড়। সেখানে থেকে আপনি নিজের ইচ্ছামতন তিলক মাটি সংগ্রহ করতে পারেন। বাল্মীকি মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি মহাদেব মন্দির। আবার একটি বীর হনুমানের মন্দিরেরও নির্মাণের কাজ চলছে।



বাল্মীকি মন্দিরে রোজদিন অন্নভোগ হয়। যে কেউ মানসিক করে এখানে অন্নভোগ নিবেদন করতে পারেন।  প্রতি পূর্ণিমায় এবং অষ্টমীতে মন্দিরে নাম সংকীর্তন হয়। মন্দির খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। 







শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিশ্বাস দিয়েই মানুষ পৃথিবীতে তীর্থ রচনা করে। রামায়ণ বর্ণিত বাল্মীকির তপোবনের সঙ্গে এই তপোবনের কোনো সম্পর্ক আছে কি নেই  , তপোবন দর্শনের জন্য সেই বিতর্কে না যাওয়াই  ভালো। কিন্ত এই স্থানের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যথার্থভাবেই প্রাচীন তপোবনের উপযুক্ত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। 





Wednesday, 7 April 2021

গাঁয়ের নাম খোয়াব গাঁ ---- ঝাড়গ্রাম

 



জঙ্গলমহলের এক রূপকথা ______ গাঁয়ের নাম খোয়াব গাঁ_______ ঝাড়গ্রাম।



ঝাড়গ্রামে কাজুবাদাম আর আকাশমনির জঙ্গলের ভিতরে স্বপ্নের গ্রাম খোয়াব গাঁ। অবশ্য এই গ্রামের নাম আগে খোয়াব গাঁ ছিল না। "লালবাজার" নামেই শহরের অদূরে এই গ্রাম পরিচিত ছিল। ঝাড়গ্রাম রেল স্টেশন থেকে পুলিশ লাইনের মেন রোড ছেড়ে কেনেল পাড়ের রাস্তা দিয়ে সোজা কাজুবাদাম আর আকাশমনির গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মোরামের উঁচুনিচু রাস্তা ধরে প্রায় চার পাঁচ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে পথের শেষে পাওয়া যাবে এই গ্রাম। তবে এই লালবাজার কথার মধ্যে যেন পুলিশ পুলিশ একটা গন্ধ রয়েছে। তাই গ্রামবাসীর সন্মতিতে ২০১৮ সালের শেষে নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা হলেন চালচিত্র অ্যাকাডেমির সম্পাদক শিল্পী শ্রী মৃণাল মন্ডল‌। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক শ্রী শিবাজী বন্দোপাধ্যায় " খোয়াব গাঁ" নামটি ঠিক করে দেন। গ্রামে শিল্পচর্চার মাধ্যমে যে স্বপ্ন বা খোয়াব বোনা হচ্ছে ---- এই নাম তারই সার্থক প্রতিফলন। 




ঝাড়গ্রাম ব্লকের রাধানগর পঞ্চায়েতের অধীন এই গ্রামে মোট ১৩ টি পরিবারের বাস। এর মধ্যে ১২টি পরিবারই লোধ সম্প্রদায়ের। রয়েছে একটি কুর্মি পরিবার। গ্রামের জনসংখ্যা মাত্র ৭৫ জন। এই ছোট্ট গ্রামের বসতি গড়ে উঠার কাহিনীটি এই রকম -------- ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজাদের চাষের জমি ছিল স্থানীয় অর্জুনডহড়, রাজবাধ আর মধুপুর মৌজায়। পঞ্চাশ দশকের কিশোর কালীপদ অহির , অধুনা প্রবীন বাসিন্দা, বাবার সাথে এসেছিলেন রাজাদের জমিতে খেতমজুরি করতে। পরে রাজপরিবারের তরফে তাঁকে থাকার ঘর দেওয়া হয়। সেদিনের কালীপদ লালবাজারের সংসার পাতেন। খেতমজুরের কাজে আসা লোধেরা রাজানুগ্রহে এলাকায় থিতু হয়ে যান। 




খেটে খাওয়া লোধ জনজাতির বাসিন্দারা কিছু দিন আগে পর্য্যন্ত  সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। জঙ্গলের ডালপালা কেটে তা সংগ্রহ করে বিক্রি, নয়তো খেতমজুর কিংবা দিনমজুরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, বা মরশুমে ভিন্ জেলায় 'নামাল' খাটতে যাওয়া। তাঁদের এই দিন-আনির সংসারে লড়াইটা ছিল খিদের সাথে। এমনিই একটা গ্রাম খুঁজছিলেন মৃণালবাবু। ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ মৃণালবাবু খুঁজে পেলেন এই লালবাজার যেখানে পরীক্ষা মূলক ভাবে শিল্পচর্চার মাধ্যমে জনজাতির মানুষজনের জীবনে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনা যায়। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা এই গ্রামেই গড়ে তুললেন " ওপেন ষ্টুডিয়ো "। প্রথমে ট্রান্সপারেন্ট শিটের উপরে আঁকা ছবির উপরে টর্চের আলো ফেলে চলচ্চিত্রের মতো ছবি দেখানো হল। হাতে কলমে দেখানো হল কি ভাবে কাজটা করা হয়েছে। তাতে বেজায় মজা পেলেন গ্রমবাসীরা। তাদেরকে ফুল, পাতা, কাঁচা হলুদ, বেলের আঠার মতো প্রাকৃতিক ও ভেষজ উপাদান দিয়ে প্রকৃতিক রং তৈরি শেখানো হলো। শুকনো ছাল-বাকল-শিকড়ের মধ্যে শিল্প আবিষ্কারের " চোখ " তৈরির কাজ গ্রামবাসীরা শিখলো। সাথে সাথে মৃণালবাবু চেষ্টা চালিয়ে গেলেন নতুন প্রজন্মের কাছে পড়াশুনার গুরুত্ব বোঝাতে। এরই ফল হিসাবে গ্রামবাসীরা শপথ নিতে শিখেছে " শিখব, পড়ব, জানব, স্কুলছুট হব না "। বেশিরভাগ পরিবারের নারী পুরুষ জঙ্গলের কাঠ কেটে মাথায় বয়ে নিয়ে গিয়ে মহাজনদের কাছে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু জঙ্গল ফুরিয়ে গেলে কি কি সমস্যা হতে পারে সেগুলো তাদেরকে বোঝানো হল। আর এর কিছুদিন পরেই এর সুফল পাওয়া গেল। বাসিন্দাদের রোজকার জীবনেও এখন পরিবর্তন এসেছে। গ্রাম পরিচ্ছন্ন রাখেন বাসিন্দারা। গ্রামের খুদেরা সময় পেলেই দেওয়ালে-দরজায় ছবি এঁকে ভরিয়ে দেয়। বাঁশ কাঠের তৈরি ময়ূর, গনেশের মুখ, কাকড়া বিছে_____ এগুলোর নাম কাটুম কুটুম। শিশুরাই এগুলো বানায়। পর্যটকেরা গ্রামে এসে কিনে নিয়ে যান লোধ শিল্পদের তৈরি কাটুম কুটুম, মাটির পুতুল, ছবি ইত্যাদি। এক সময় জঙ্গলজীবি মানুষজন রুজির টানে বনজ সম্পদ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এখন তারাই জঙ্গল রখ্খা করেন। তাদের এখনকার প্রতিঞ্জা --- " আমরা সারা জীবন যত গাছ কেটেছি, তার থেকেও অনেক বেশি গাছ লাগানোর প্রতিঞ্জা করছি " ।




এরই মাঝে কথায় কথায় এক প্রবীনের মুখে আখ্যেপের সুর বেজে উঠলো। তিনি জানালেন   " আমাদেরও যে সন্মান থাকতে পারে, সেটা আগে কখনোও ভাবিনি। ছোটবেলায় শুনেছি বাপ-ঠাকুরদাকে প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দিতে হতো। আমরা নাকি অপরাধী জাতি। এক সময় বিদেশিরা আমাদের অপরাধ প্রবণ তকমা দিয়েছিল, এখন সেই বিদেশি লোকজন আমাদের শিল্পের প্রসঙসা করেন, জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান "।




সত্যি বলতে কি ঝাড়গ্রাম ট্রাফিক পুলিশ বা আপনার ওখানকার বেড়ানোর গাড়ীর ড্রাইভার বা স্থানীয় অনেক লোকই এই রূপকথার গ্রাম সম্পর্কে অবগত নয়। হতাশ হবার কিছু নেই। ঐ গ্রাম তো রয়েছে _____ শুধু মাত্র লোকচক্ষুর অন্তরালে তিলে তিলে গড়ে উঠছে সেই রূপকথা।




ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। অনেকেই হারিয়ে যেতে আসছেন এই কাজুবাদাম আর আকাশমনির জঙ্গলের ভেতর। ইচ্ছে হলে আপনিও কিছুদিন কাটিয়ে যেতে পারেন। বাংলার লোকজীবন আর ছবি যদি আপনাকে আকর্ষন করে -------- এই গ্রামের হাতছানি তাহলে আপনি কিছুতেই এড়াতে পারবেন না।